fbpx
একনজরে আজকের যুগশঙ্খকলকাতা

গড়িয়াহাট জোড়া খুন রহস্যের সমাধান হয়ে গিয়েছে, বললেন পুলিশ কমিশনার সৌমেন মিত্র 

নিজস্ব প্রতিনিধি: গড়িয়াহাটে জোড়া খুনের ঘটনায় তদন্তের জাল গুটিয়ে নিয়েছে কলকাতা পুলিশ। এই রহস্যের সমাধান হয়ে গিয়েছে, এমনটাই দাবি করলেন কলকাতার পুলিশ কমিশনার সৌমেন মিত্র। তাঁর কথায় খুনি কে, তা জেনে ফেলেছেন তদন্তকারীরা। তিনি বলেন, ‘‘আমাদের গোয়েন্দা বিভাগ এবং অন্য অফিসাররা মিলে গড়িয়াহাটের জোড়া খুনের ঘটনার সমাধান করেছেন। আরও কয়েকজনকে গ্রেফতার করা বাকি আছে।’’ শীঘ্রই তারা ধরা পড়বে বলে মনে করছেন তিনি।

গত রবিবার গড়িয়াহাটের কাঁকুলিয়ায় খুন হন শিল্পকর্তা সুবীর চাকী এবং তাঁর গাড়ির চালক রবীন মণ্ডল। ওই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে বুধবার মিঠু হালদার নামে এক মহিলাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। একটা সময় মিঠু পরিচারিকার কাজ করত খুন হওয়া সুবীর চাকীর বাড়িতে। গোয়েন্দারা তাকে টানা জিজ্ঞাসাবাদ করে জানতে পেরেছে জোড়া খুনের ষড়যন্ত্রে সে সরাসরি জড়িত। এর পর তদন্তকারী অফিসাররা আরও জানতে পারেন, মিঠুর বড় ছেলে ভিকি হালদারই এই খুনের ঘটনায় মূল অভিযুক্ত। কিন্তু তাকে এখনও গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। সেই সঙ্গে খুনের ঘটনায় জড়িত আরও কয়েকজন এখনও পলাতক। তবে সকলেই ধরা পড়বে বলে মনে করছে পুলিশ। মূলত সেই প্রসঙ্গে এদিন সৌমেন মিত্র বলেছেন, ওই খুনের ঘটনায় রহস্যের সমাধান হয়ে গেলেও দোষীদের এখনও গ্রেফতার করা যায়নি। তবে দোষীদের ধরা যে স্রেফ সময়ের অপেক্ষা, সেটাও বুঝিয়ে দিয়েছেন তিনি।

বুধবারই মিঠুর ডায়মন্ড হারবারের বাড়িতে তল্লাশি চালায় পুলিশ। সেখান থেকে বেশ কয়েকটি রক্ত মাখা পোশাক উদ্ধার করা হয়। ওই পোশাক ভিকি এবং তার সঙ্গীদের বলেই অনুমান পুলিশের।

মিঠু যে বাড়িতে ভাড়া থাকে, সেই বাড়ির মালিক বলেন, দু’দিন আগে ওই রক্ত লাগা পোশাক মিঠুকে কাচতে দেখেছিলেন তিনি। প্রশ্ন করায় মিঠু তাঁদের বলে, ছেলে পুজোয় মারপিট করেছে। তাতে জখম হওয়ায় রক্ত লেগেছে পোশাকে। কিন্তু এই কথা বিশ্বাস করেননি বাড়ির মালিক।

খুনের ঘটনার পর লালবাজার ডগ স্কোয়াডের অভিজ্ঞ সারমেয় জিপসি’কে ঘটনাস্থলে নিয়ে যান গোয়েন্দারা। জিপসি সেই বাড়ির বিভিন্ন জায়গার গন্ধ শুঁকে পৌঁছে যায় বালিগঞ্জ স্টেশনে। পুলিশ বুঝে যায় খুনিরা বালিগঞ্জ থেকে ট্রেনে চেপে চম্পট দিয়েছে। সেই সূত্রে মিঠু হালদারকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

এরপর মিঠুকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তদন্তকারীরা জেনেছেন, সুবীরের বাড়ি থেকে কিছুটা দূরেই কাঁকুলিয়া রেল গেটের কাছে মিঠুর শ্বশুরবাড়ি। মিঠু বেশ কয়েক বছর সেখানে ছিল। তবে স্বামীর সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় সে ডায়মন্ড হারবারের ওই বাড়িতে চলে আসে।

উল্লেখ্য সুবীর কাঁকুলিয়ায় তাঁর পৈতৃক বাড়িটি বিক্রির চেষ্টা করছিলেন দীর্ঘ দিন ধরেই। কাগজে সেই বিজ্ঞাপন দেখে এর আগে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল মিঠুর ছেলে ভিকি। রবিবার নতুন ক্রেতা সেজে সে ফের সুবীরবাবুর সঙ্গে দেখা করে। কিন্তু সুবীর তাঁকে চিনে ফেলেন বলে মনে করছেন গোয়েন্দারা। সম্ভবত তারপরেই সুবীরকে হত্যা করে ভিকি এবং তার সঙ্গীরা।

খুন করে ঢাকুরিয়া স্টেশনে আসে ভিকিরা, সেখানেই মিঠুকে রক্তমাখা জামাকাপড় তারা দিয়ে দেয়।   এদিকে ডায়মন্ড হারবার থেকে গ্রেফতার হওয়া মিঠু হালদারকে বৃহস্পতিবার ১৪ দিন পুলিশি হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন আলিপুর আদালতের বিচারক। তদন্তকারীদের সূত্রে আরও জানা গিয়েছে, মিঠু পেশায় পরিচারিকা। সেই সঙ্গে সে জমি-বাড়ির দালালিও করত। একই কাজে যুক্ত রয়েছে তার ছেলে ভিকি। তার নামে পুলিশের কাছে পুরনো অভিযোগ রয়েছে। মিঠুকে কলকাতায় নিয়ে এসে জেরা করার পরে তদন্তকারীরা বুঝতে পারেন, সে এই খুনের ঘটনার প্রধান পাণ্ডা। জেরায় গোয়েন্দারা জানতে পারেন, কাঁকুলিয়া রোডের বাড়ি বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়ার পরে মিঠু-ভিকিরা বাড়িটি কিনতে চায়। কিন্তু বাড়ির দাম দেড় কোটি টাকা চাওয়ায় ভিকি বুঝতে পারে সেটি তার নাগালের বাইরে। তখন ভিকি চেয়েছিল কোনও ভাবে সুবীরবাবুকে ফাঁদে ফেলে কিছু টাকা রোজগার করে নিতে। সে কথা মিঠুকেও জানায় সে।  এ সব ঘটনা মাসকয়েক আগের। পরবর্তীকালে কলকাতার একটি জায়গায় নিরাপত্তারক্ষীর কাজ নিয়ে চলে আসে ভিকি।

এরপর গত রবিবার দুপুর আড়াইটে নাগাদ সুবীরবাবু নিউটাউনের বাড়ি থেকে কাঁকুলিয়া রোডের উদ্দেশে রওনা দেন। সেদিন বাড়ি দেখতে এক খদ্দেরের আসার কথা ছিল। গাড়িচালক রবীনকে নিয়ে তিনি কয়েকটি জায়গা ঘুরে কাঁকুলিয়া রোডের বাড়িতে আসেন। পাঁচটা নাগাদ তাঁর নিউটাউনের বাড়িতে থাকা মা-কে ফোনও করেন। কিন্তু তখনও জানেন না খদ্দের হিসাবে যার আসার কথা, সে আসলে ভিকি। অন্য পরিচয় দিয়ে এবং অন্য নম্বর থেকে যোগাযোগ করেছিল ভিকি।

কাঁকুলিয়া রোডের বাড়িতে আসার পর রবীন উপরে চলে যান। দোতলায় ছিলেন সুবীর। কলিং বেল শুনে সুবীর নিজেই দরজা খোলেন। তখন ঘরের ভিতরে ঢুকে পড়ে ভিকিরা। এরপরেই ভিকি এবং তার সঙ্গীরা সুবীরের হাতের ব্রেসলেট-সহ সোনার অলঙ্কার খুলে নেয়। হাতিয়ে নেয় মানিব্যাগ। সেই সঙ্গে আরও টাকা চেয়ে হুমকি দিতে থাকে তাঁকে। এভাবে পরিচয় গোপন করে সেখানে লুঠ করতে গিয়েছিল ভিকিরা। কিন্তু সুবীর তাদের চিনে ফেলায় তাঁকে একটি ছুরি দিয়ে এলোপাথাড়ি কোপানো হয়। চিৎকার শুনে উপর থেকে নীচে নেমে আসার চেষ্টা করেন রবীন। তাঁকেও সেখানে ওই ছুরি দিয়ে কোপানো হয়। ঘটনাস্থলেই দুজনের মৃত্যু হয়।

ঘটনাস্থলে ভিকি থাকলেও মিঠু ছিলেন না বলে গোয়েন্দা সূত্রে খবর। তবে মিঠু কাঁকুলিয়া রোডের আশেপাশেই ছিল। একটি নির্দিষ্ট এলাকায়, একটি নির্দিষ্ট সময়ে কোন কোন নম্বর থেকে কোথায়, কোথায় ফোন করা হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই পদ্ধতিকে বলা হয় ‘টাওয়ার ডাম্পিং’। সেখান থেকেও কিছু জোরালো সূত্র মেলে। তার পরেই মিঠু এবং ভিকির উপর নজরদারি শুরু হয়। পরে মিঠুকে গ্রেফতার করলেও ভিকি এখনও অধরা। চলতি বছরেই ওই বাড়িতে রং এবং জলের লাইনে মেরামতির কাজ করিয়েছিলেন সুবীর। সেই সূত্রে কিছু মিস্ত্রির ভূমিকাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনাস্থলে পাঁচ জন ছিল বলেই প্রাথমিক ভাবে জানতে পেরেছেন গোয়েন্দারা।

তদন্তাকারীদের সূত্রে জানা গিয়েছে, জোড়া খুনের পর ভিকিরা চলে যায় ঢাকুরিয়া স্টেশনে। তবে তারা কাঁকুলিয়া রোডের বাড়িতে যাওয়ার জন্য বালিগঞ্জ স্টেশনে নেমেছিল বলেই গোয়েন্দাদের দাবি। ঢাকুরিয়া স্টেশনে তখন ভিকিদের জন্য অপেক্ষা করছিল মিঠু। তার হাতেই রক্তমাখা জামাকাপড় দিয়ে ভিকি চলে যায় নিজের কর্মস্থলে। সেখানে নাইট ডিউটিও করে ভিকি।  এভাবেই ধাপে ধাপে এগিয়ে রহস্যের সমাধান করে ফেলেছেন গোয়েন্দারা।

Related Articles

Back to top button
Close