fbpx
পশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার বাংলার লোক শিল্পী গোষ্ঠগোপাল

শ্যামল কান্তি বিশ্বাস: নদীয়া: সোশ্যাল মিডিয়ার এত বাড়বাড়ন্ত না থাকলে ও যখন পাশ্চাত্য সভ্যতা এবং উগ্র ছায়াছবির দাপটে বাংলার লোকসংস্কৃতি বিপন্ন, শহর,গ্ৰামগঞ্জ জুড়ে দাপিয়ে চলছে ভিডিও ব্যবসা। নতুন প্রজন্ম যখন বঙ্গ সংস্কৃতির প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির কুয়াশাচ্ছন্ন আকাশে হাবুডুবু খাচ্ছে ঠিক তখনই বাংলার আকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্রের আবির্ভাব। বিপন্ন লুপ্তপ্রায় লোক সংস্কৃতিকে রক্ষা করার মহা ব্রত নিয়ে আবির্ভূত হলেন দিনাজপুর জেলার এক অখ্যাত ও প্রত্যন্ত গ্রামের যুবক। পিতা দীনবন্ধু দাসও মাতা হরিদাসী দাসের গর্ভজাত সন্তান গোষ্ঠ গোপাল দাস। গোষ্ঠ গোপালের শৈশব কেটেছে হুগলি জেলার লক্ষণপুরের বাড়িতে। শৈশব থেকেই কেমন যেন ভাবুক প্রকৃতির স্বভাব ফুটে ওঠে গোষ্ঠ গোপালের চরিত্রে। সঙ্গীত শিক্ষা পিতা দীনবন্ধু দাসের নিকট। ধীরে ধীরে অভাবের সংসারে পরিস্থিতি এবং কর্তব্য পালনের লক্ষ্যে গোষ্ঠ গোপালকে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হতে হয়। প্রিয়তমা স্ত্রী গীতা দাসের সান্নিধ্যে এলেও সংসারে তেমন মন বসেনি। রাস্তায়, মাঠে-ময়দানে গান করতে ভীষণ ভালোবাসতেন কৈশোর থেকে যৌবনে পদার্পিত গোষ্ঠ গোপাল।

কখনো খমক বাজিয়ে,কখনো খালি গলায় এইভাবে সামাজিকতায় অর্থের প্রয়োজনে ফুটপাতে বসে কিংবা ফুটপাতে মজমাদারদের সঙ্গে ওষুধ বিক্রির পথমঞ্চে গানের আসর জমাতে দ্বিধাবোধ করেননি গোষ্ঠ গোপাল। কখনো ট্রেনের কামরায় এই অনামী শিল্পীকে রেলযাত্রীদের গান শুনিয়ে অর্থোপার্জন করতে হয়েছে। হঠাৎ এক গানের অনুষ্ঠানে সুবল দাস বাউল এর আমন্ত্রণে নদিয়ার আড়ংঘাটায় যোগদান করেন। ওখানেই আলাপ বগুলার বাউল সন্তান নেপাল দাস বাউলের সঙ্গে। এরপর বহুবার গোষ্ঠ গোপাল আড়ংঘাটায় এসেছেন। বাউল সন্তান নেপাল দাস ও ছুটেছেন প্রানের টানে গোষ্ঠ দর্শনে। এইভাবে ঘনিষ্ঠতা বাড়তে বাড়তে কোনএকদিন নেপাল দাসের আমন্ত্রণে বগুলার মাটিতে পা রাখলেন সেদিনের সেই অনামীশিল্পী গোষ্ঠ গোপাল দাস। একান্ন পীঠস্থান শ্যামা মায়ের আরাধনাস্থল পবিত্র বগুলার মাটি স্পর্শ করে গোষ্ঠ গোপালের শিল্পী জীবনের সাফল্য শুরু। গোষ্ঠগোপালের গান মানুষকে মাতোয়ারা করে তুলল। বাংলার আকাশে বাউল গানকে নতুন অলঙ্কারে সাজালেন গোষ্ঠ গোপাল। এইভাবে অগণিত ভক্তের আকুল প্রার্থনায় তার জনপ্রিয়তা ছাপিয়ে দেশের বাইরে বিস্তার লাভ করল। প্রতিষ্ঠিত হলেন বাউলসম্রাট পদমর্যাদায়। পূর্ণদাস বাউলের পর গোষ্ঠ গোপাল দাস ই স্বাথক লোকশিল্পী যিনি, গ্রাম বাংলার লোক সংস্কৃতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনলেন।

নবজাগরণের ঝড় তুললেন বাংলার লোকসংগীতে। সূচনা করলেন এক নতুন অধ্যায়ের। সাফল্যের শীর্ষে তুলে ধরলেন লোক সংস্কৃতিকে। ইতিমধ্যেই সুরকার পরিতোষ রায় এবং নীলকমল রায় আবিষ্কার করে নিতে ভুল করলেন না গোষ্ঠ গোপালের সংগীতপ্রতিভাকে। তারা ধীরে ধীরে গোষ্ঠ গোপাল কে নিয়ে একের পর এক গানের রেকর্ডিং করাতে লাগলেন। এগিয়ে এলেন গাথানী এবংএইচ,এম,ভি রেকর্ড কোম্পানি গুলি। সারা রাজ্যে লোক সংস্কৃতির ধারায় তার গান এক শৈল্পিক পরিবর্তন নিয়ে এলো।ডাক এলো আকাশ বানী ও দূরদর্শনে গানের অনুষ্ঠান করার জন্য। সেখানে ও তিনি সাফল্য দেখালেন। রাতারাতি জনপ্রিয়তা,সমগ্ৰ রাজ্য সহ দেশ ছাপিয়ে ইউরোপ মহাদেশ পর্যন্ত পৌছে গেল। গানের সুবাদে গোষ্ঠ গোপাল পাড়ি দিলেন সুদূর বিদেশে। অনুষ্ঠান করলেন লন্ডনে।এভাবেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন ।প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী আততায়ীদের হাতে নিহত হওয়ার পর সমগ্র দেশে নেমে আসে শোকের স্তব্ধতা।

গান বাঁধলেন গোষ্ঠ গোপাল, ভীষন মর্ম স্পর্শী এই সংগীত অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করলেন বহু ভাষাভাষী সমগ্ৰ দেশের জনগণ,প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা তনয় রাজীব গান্ধী পুরস্কার দেওয়ার জন্য দূত মারফত ডেকে পাঠালেন গোষ্ঠ গোপাল কে।প্রয়াত প্রধানমন্ত্রীর অকালপ্রয়াণে তিনিও দেশবাসীর সঙ্গে সমব্যাথী ছিলেন, তাই শিল্পী হিসেবে তিনি নৈতিক দায়িত্ব পালন করেছেন, এই জন্য পুরস্কার নিতে রাজি না হওয়ায় আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করলেন।দুঃখের বিষয় বাউল জগৎ গোষ্ঠ গোপাল কে বেশি দিন,ধরে রাখতে পারেনি। কিছু ক্ষমতালোভী, স্বার্থন্বেষী বাউল শিল্পী তাকে দমিয়ে রাখার জন্য চেষ্টা করেছেন প্রতিনিয়ত।আশঙ্কা ছিল, তার উপস্থিতি তাদের বাজার মন্দার কারণ হয়ে উঠবে।গোষ্ঠ গোপালকে বিভিন্ন ছলচাতুরি প্রয়োগ করে ড্রাগের নেশায় ডুবিয়ে রাখার চেষ্টা চলছিল অবিরত।

আরও পড়ুন: কলকাতার মোট ২২৭টি এলাকা কন্টেনমেন্ট জোন, দেখে নিন

নিন্দুকেরা পরবর্তীতে সেই প্রচেষ্টায় সফল ও হয়েছেন। অকালমৃত্যু হাতছানি দিয়েছে। নিয়তি কেড়ে নিয়েছে তার আত্মাকে।প্রায় দু’শোর উপরে গান রেকর্ডিং করেছেন তিনি। তাঁর অকাল প্রয়াণে সমগ্ৰ বাউল জগতে যে এক ব্যাপক ক্ষতি হলো তা ভবিষ্যতে পূরণ হওয়া অসম্ভব। মৃত্যুকালে দুই স্ত্রী সহ একপুত্র ও তিনকন্যা বর্তমান। প্রথমা স্ত্রী র জৈষ্ঠপুত্র গোকুল গোষ্ঠ দাস তার বাবার ধারায় এগিয়ে চললেও ড্রাগের নেশা তার জীবনকে কেড়ে নিয়েছে। গাঁথনি এবং কিরণ রেকর্ডিং কোম্পানি থেকে বেশ কিছু গানের ক্যাসেট রেকর্ডিং করেছিল গোকুল গোষ্ঠ দাস।

গোষ্ঠ গোপালের খুব কাছের শিষ্য সত্য রঞ্জন মন্ডল, নেপাল দাস বাউল এবং শেখর দাস বাউল ইতিমধ্যেই যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন।বগুলা মহাকাল আশ্রম গোষ্ঠ গোপালের এক অনবদ্য অবদান।১৯৮৬ সালের ৪ টা ডিসেম্বর মাত্র ৪২বছর বয়সে এই বাউল সম্রাট’ গোষ্ঠ গোপাল দাস পরলোকগমন করেন। পরিশেষে বলা যায় তার সুললিত কন্ঠের হৃদয়গ্রাহী লোকসঙ্গীত এখনও খাল-বিল মেঠো রাস্তা ও শহরের রাজপথে মানুষের মুখে মুখে অনায়াসেই ধ্বনিত হয়।তার এই গান যেমন -আমি যাব না আর রথের মেলাতে ও জামাইবাবু যাবো না রথের মেলাতে অথবা ও গুরুজি কি মাছ ধরেছ বড়শি দিয়া ..ইত্যাদি । আধ্যাত্মিক ভাবমূলক এই সব সঙ্গীত গ্রাম-শহরের বহু মানুষের কাছে এখনো সমান জনপ্রিয়। এইসব আধ্যাত্মিক ভাবমূলক গান যেমন যুগে যুগে মানুষের কণ্ঠে বেঁচে থাকবে তেমন হৃদয় জুড়ে বেঁচে থাকবে সম্রাট বাউল গোষ্ঠ গোপাল দাস।

Related Articles

Back to top button
Close