fbpx
ছবিবিনোদনহেডলাইন

ছবিতে ছবির মানুষ

যুগশঙ্খ ডিজিটাল ডেস্ক: হেমন্তের শিশিরে পায়ের ছাপ মুছে দিয়ে চলে গেলেন তিনি। বাইরে যখন আলোকমালায় সজ্জিত হয়ে শহর লড়ছিল নিকষ কালো অমাবস্যার অন্ধকারের সঙ্গে, তখন তিনি কার্যত সাঙ্গ করছিলেন তাঁর প্রাণের খেলা। মনে মনে হয়তো বলছিলেন, আর কেন? অনেক তো হল। এবার যে যেতে হবে।  হ্যাঁ, যেতে হবে। যেতে হয়। রবিবার, ১৫ নভেম্বর, বেলা ১২.১৫ মিনিটে অবশেষে সত্যি সত্যিই তাঁর অভিযান থামল। ঠিক যেখানে সৌমিত্র থামলেন, সেখান থেকেই ‘নরসিংহ’-এর সঙ্গে ব্যাকগিয়ারে আরও একবার সফর শুরু করা যাক।

১৯৩৫ – এ জন্ম। কৃষ্ণনগরে বড় হওয়া। বাংলা নিয়ে পড়াশোনা। বাড়িতেই নাটক – গান – সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল পেয়েছিলেন সুমিত্রানন্দন সৌমিত্র। না, তাঁর মায়ের নাম  ছিল আশালতা চট্টোপাধ্যায়। বাবা ছিলেন মোহিত চট্টোপাধ্যায়।

রেডিওর ঘোষক হিসাবে রোজগার শুরু। ১৯৫৬-তে সত্যজিৎ দেখলেন বটে, কিন্তু নিলেন না। বললেন, অপেক্ষা কর। ‘সবুর কা ফল মিঠা হোতা হ্যায়’ – এই প্রবাদবাক্য অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেল তাঁর জীবনে। ১৯৫৯ – এ সেই অপেক্ষার অবসান হল। ইতিমধ্যে বিয়ে করলেন তৎকালীন রাজ্যস্তরের চ্যাম্পিয়ান ব্যাডমিন্টন খোলোয়াড় দীপা চট্টোপাধ্যায়কে। ১৯৫৮-র সেই বিরল মুহূর্তের ফ্রেমবন্দিতে আগামীর সৌমিত্র-দীপা মাঝখানে আশীর্বাদক শ্বশুরমশাই চন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়।

‘পথের পাঁচালী’ মুক্তির পর অনেকে বলেছিলেন দারিদ্রকে উপজীব্য করে ছবি বানিয়েছেন সত্যজিৎ। ‘পথের পাঁচালী’-র সেই দারিদ্র ‘অপুর সংসার’-এও ছিল। অভাবকে হাসিমুখে মেনে নিয়ে অপু-অপর্ণা-র সুখের সংসারে বেজেছিল বাঁশি। সেই বাঁশির ধ্বনি সৌমিত্র ৮৫-তেও শুনিয়ে গেছেন।

‘অপুর সংসার’ মুক্তির পর সত্যজিৎ সৌমিত্রকে বলেছিলেন, ‘ছবিটা অনেকেই দেখেছেন। তোমার ডাক আসবে।’ সেই ডাক শেষদিন পর্যন্ত এসেছে।  ছবিটি মৃণাল সেনের ‘আকাশ কুসুম’ সিনেমার স্টিল। সঙ্গে অপর্ণা সেন। ‘সমাপ্তি’ দিয়ে দু’জনে যে পথ চলা শুরু করেছিলেন, সেই পথ চলা থামল ‘বহমান’  -এ।

ঋত্বিক ঘটক বাদে বাকি সব পরিচালকের সঙ্গেই তিনি কাজ করেছেন।  তপন সিংহ – এর সঙ্গে কাজ করা সকল ছবিতেই  তাঁকে পাওয়া গেছে অন্য মেজাজে। তেমনই এক ছবি, ‘ক্ষুধিত পাষাণ’। সৌমিত্রের বিপরীতে ছিলেন অরুন্ধতী দেবী।

সত্যজিতের ডাকের পরে যে মানুষটি তাঁকে প্রথম ডেকেছিলেন তিনি তপন সিংহ। ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ – এর পরে ১৯৬১ – তে তপনবাবু মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিলেন বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির মহানায়ক ও আগামীর লম্বা রেসের ঘোড়া সৌমিত্রকে। ‘ঝিন্দের বন্দী’-র পরেও অনেক ছবিতে এই দু’ই নক্ষত্রকে পেয়েছি আমরা।

পৃথিবীর চলচ্চিত্রে এমন অনেক দৃশ্য আছে যা ক্লাসিক। সেই সব দৃশ্যের মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে ‘সাত পাকে বাঁধা’ ছবির পাঞ্জাবী ছেড়ার দৃশ্যখানি। নিশ্চয়ই মনে পড়ছে রাগে, দুঃখে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে সুচিত্রা সেন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পাঞ্জাবীখানা ছিঁড়ে দিলেন কেমন করে। না, সেই দৃশ্য নয়, রইল ওই ছবিরই অন্য দৃশ্য।

৬১ বছরের উজ্জ্বল কর্মময় জীবনের যত ছবিতে অভিনয় করেছেন তার মধ্যে বেশি আলোচিত হয়েছে সত্যজিতের ছবিগুলি নিয়ে। মাধবী মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে সত্যজিতের যে তিনটি ছবি তার দু’টিতেই ছিলেন সৌমিত্র। ১৯৬৩ – তে অজয় করের সুখেন্দু দত্তকে (সাত পাকে বাঁধা) কালো মোটা ফ্রেমের চশমা ও গোঁফে একটু ভারিক্কি বয়স দেখালেও ১৯৬৪ –তে সত্যজিৎ আবার তাঁকে সদ্য যৌবনে পা রাখা অমল করলেন ‘চারুলতা’-য়। শুটিং-এর ফাঁকে পরিচালক ও সহশিল্পীদের সঙ্গে।

ছবিটি ‘কাপুরুষ’ ছবির একটি দৃশ্য। অর্থের অভাবে যে ভালোবাসাকে অমিতাভ একদিন বঞ্চনা করেছিল সেই ভালোবাসাই আজ অন্য কারোর সঙ্গে। হতবাক অমিতাভ আর নির্লিপ্ত করুণা।

কাজের মাঝে কোনওদিন ভোলেন নি তাঁর দায়িত্ব ও কর্তব্যকে।  ছেলে- মেয়ে সকলের প্রতিই ছিল সমান দৃষ্টি। কাজের জন্য বাইরে থাকলেও মেয়েকে নিয়মিত লিখেছেন চিঠি।

সত্যজিতের ‘চারুলতা’ সারা বিশ্বেই সমাদৃত হয়েছিল। সম্মান এসেছিল নানা দেশ থেকে। তেমনই এক অনুষ্ঠানে বার্লিনে নায়ক সৌমিত্র সঙ্গে শশী কাপুর ও অন্যান্যরা।

‘উদয়ন’ পণ্ডিতকে আমাদের ছোটরা কতটা মনে রেখেছে তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। ‘ফেলুদা’ যতটা কাছের ‘উদয়ন’ ততটা নয় কিন্তু সেই দাঁড়িওয়ালা পণ্ডিতই মূর্তির মাঠে হাঁক দিয়ে বলেছিলেন, ‘দড়ি ধরে মার টান, রাজা হবে খান খান।’

এক নম্বরই, দু’নম্বরই, তিন নম্বরই – সৎ পথে টাকা রোজগার করা বাবার চার ছেলে। তার মধ্যে মেজো ছেলেই বাবার রেপ্লিকা। কিন্তু অ্যাকসিডেন্টে শারীরিক ভাবে পঙ্গু সে। মনে পড়ছে নিশ্চয়ই ছবির নাম। ‘শাখা প্রশাখা’। খাবার টেবিলে বা হাত দিয়ে একই রিদিমে মারা-র দৃশ্যটা আজও জ্বলজ্বল করে। ছবির শুটিং – এ প্রশান্তকে দৃশ্য বোঝাচ্ছেন সত্যজিৎ।

শুধু সত্যজিৎ বা তপন সিংহ নয়। কাজ করেছেন অজয় কর, দীনেন গুপ্ত, তরুণ মজুমদার, সলিল সেন, পলাশ বন্দ্যোপাধ্যায়, অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়, আশুতোষ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ। পরবর্তীতে গৌতম ঘোষ, সন্দীপ রায়, স্বপন সাহা, ঋতুপর্ণ ঘোষ, অপর্ণা সেন, অতনু ঘোষ, সুমন ঘোষ, নন্দিতা রায় – শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, সৃজিত মুখোপাধ্যায়, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় – সবার সঙ্গেই। ছবিটি ‘সংসার সীমান্তে’-এর স্টিল।

শুধু অভিনয় নয়। ছিল অগাধ পড়াশোনা। লেখালিখি। অনুবাদ। সম্পাদনা। ছবি আঁকা। সময় পেতেন কেমন করে তা আজ বিস্ময়!

২০১৪ সালের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত হয় তাঁর কবিতাসমগ্র।

তিন খণ্ডে প্রকাশিত তাঁর নাটক সমগ্র – এর প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয় ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে।

রং-তুলিতে ভরিয়েছেন ক্যানভাস। সমাদর পেয়েছেন চিত্রমহলেও।

চলাই জীবন। তিনি মনে করতেন অভিনয় ছাড়া তিনি আর কিছু পারেন না। তাই কাজ তাঁকে করে যেতেই হবে। এক সময় বয়সের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টেছে তাঁর চরিত্র, চেহারা, অভিনয় শৈলী। বিরতিহীন কর্মজীবনের দ্বিতীয় ইনিংসেও কাজ করেছেন প্রবল ভাবে।

১৯৯২ সালে মুক্তি পায় তপন সিংহের ‘অন্তর্ধান’। সেই ছবির শুটিং – এ অন্তরঅঙ্গ পরিচালক ও শিল্পী।

গৌতম ঘোষের ‘দেখা’ সৌমিত্রের জীবনের অন্যতম মাইলস্টোন। ঝাপসা হতে থাকা দৃষ্টি নিয়ে অন্তরের দৃষ্টি দিয়ে দেখাই তো ‘দেখা’। পরিচালকের সঙ্গে শিল্পী।

কাজ করেছেন নতুন প্রজন্মের সঙ্গেও। ‘সাঁঝবাতি’ ছবিতে দেব – সৌমিত্র।

ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তের সঙ্গে সৌমিত্র।

অনীক দত্তের ‘বরুণবাবুর বন্ধু’ ছবির স্টিল।

পরমব্রতের পরিচালনায় শেষ করে গেছেন বায়োপিক ‘অভিযান’। আপামর বাঙালি অপেক্ষায় সেই অভিযান দেখার।

ঝুলিতে রয়েছে অনেক পুরস্কার। ভারতীয় ছবির জগতের শ্রেষ্ঠ পু্রস্কার দাদাসাহেব ফালকে এসেছিল ২০১১ – তে।

ফ্রান্সের সর্বোচ্চ সম্মান লিজিয়ঁ অব অনার পেয়েছেন ২০১৭ – তে।

কবিতা পাঠেও ছিলেন সাবলীল। রবীন্দ্রনাথ থেকে জীবনানন্দ, সুকান্ত, সুকুমার এমনকী আধুনিক কবিদের কবিতাও তাঁর কণ্ঠে শুনে আমরা আপ্লুত হয়েছি।

নাটকে মূলত কাজ করেছেন মেয়ে পৌলমীর সঙ্গে। শেষের দিকে পৌলমীর পরিচালনাতেও কাজ করেছেন তিনি। শ্রুতিনাটক, পাঠ তাতেও সঙ্গী হয়েছে মেয়ে।

অবসরে সখ্যতা গড়ে তুলেছিলেন প্রকৃতির সঙ্গে। তাদের যত্ন নিতেও ভুলতেন না।

মৃণাল-সৌমিত্র এবং অমিতাভ-সৌমিত্র উভয়কেই দু’চোখ ভরে দেখেছে এ শহর।

একদিকে সত্যজিৎ অন্যদিকে আপন মাসি সুচিত্রা মিত্র – উভয়ের অনুপ্রেরণায় সংগীতের প্রতি তৈরি হয়েছিল অগাধ অনুরাগ।

হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া – সৌমিত্র মুখোমুখি।

শ্যাম বেনেগেলের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ এসেও করা হয়নি। তিনি বলতেন বাংলার মানুষই তাঁকে ভালোবেসেছেন। কিন্তু সেই অ্যাকশন – কাট –ই মিলিয়েছে এই দুই তারকাকে।

দুই ফেলুদা।

‘একটি ভালোবাসা / সব ভালোবাসাকে ডেকে তোলে – / আর স্বপ্ন নয়/ কুসুম কানন নয় / এবার যে যেতে হবে।

আমার যা কথা ছিল হয়ে গেল সারা।

সব কথা বলা হল, বাকি রয়ে গেল শুধু বলিতে।

 

ছবির ঋণ স্বীকার:  তারাপদ বন্দ্যোপাধ্যায়, নিমাই ঘোষ, সুকুমার রায়, ফিল্ম ডিভিশনস, ভারত সরকার, প্রতাপ দাশগুপ্ত ও সৌরভ দত্ত।

 

 

Related Articles

Back to top button
Close