fbpx
অন্যান্যঅফবিটহেডলাইন

তমসার পার করে সকালের কামনায় বিশ্ববাসী

ভাস্করব্রত পতি, তমলুক: ‘রাতের সাথে সখ্যতা হয়েছে অনেক / এবার দিনের আলো চাই / জীবনানন্দের মতন রাতের পথিক নই / রবীন্দ্রনাথের মতন প্রেমের কবি নই / নজরুলের মতন বিদ্রোহী মনও নেই আমার / তাই সুন্দর সকালের আশায় / প্রভাতের শিশির ছুঁতে চাই’ – এ আর্তি কবি আবু নাসের জুয়েলের। ‘সকালের প্রতীক্ষায়’ তাঁর এই একান্ত চাওয়া। এ চাওয়াটা আজ যেন সারা বিশ্ববাসীর। প্রত্যেকেরই মনের কথা। অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে ভেসে আসছে একটাই সুর – ‘রাত্রির বৃন্ত থেকে ছিঁড়ে আনো ফুটন্ত সকাল’!

বিশ্বজুড়ে তমিস্রার ঘনান্ধকার। চারিদিকে কি হয় কি হয় ভাব! মৃত্যুমিছিলে একটাই স্লোগান ‘আমরা এ কোন পৃথিবীর বাসিন্দা’? এত অন্ধকার কেন? এতো দুঃখ কেন? এতো স্বজনহারাদের হাহাকার কেন? আজ করুণ কন্ঠে উচ্চারণ করছি কবিগুরুর সুরে – ‘সকাল বেলার কুঁড়ি আমার বিকালে যায় টুটে / মাঝখানে হায় হয়নি দেখা উঠল তখন ফুটে / ঝরা ফুলের পাপড়িগুলি ধুলো থেকে আনিস তুলি / শুকনো পাতার গাঁথবো মালা হৃদয়পত্রপুটে’।

আমরা কি একটা সুন্দর সকালের আশা করতে পারি না? যে সকাল ঘুম ভাঙাবে পাখির কলকাকলি দিয়ে। যে সকাল ঘুম ভাঙাবে মোলায়েম সূর্যের আলো গায়ে মাখিয়ে। যে সকাল ঘুম ভাঙ্গাবে কালিমাহীন,  জড়তাহীন, মৃত্যুভয়হীন এবং নবপ্রাণচঞ্চলতার আবেশ মাখা এগিয়ে চলার মন্ত্র নিয়ে। সেই কবিগুরুর কথায় – ‘রুদ্র তোমার দারুণ দীপ্তি / এসেছে দুয়ার ভেদিয়া /বক্ষে বেজেছে বিদ্যুৎবাণ / স্বপ্নের জাল ছেদিয়া / ভাবিতেছিলাম উঠি কি না উঠি / অন্ধ তামস গেছে কিনা ছুটি / রুদ্ধ নয়ন মেলি কি না মেলি / তন্দ্রা জড়িমা মাজিয়া’।

আসলে এখন আমরা একটা ভয়ের আবহে নিমজ্জমান। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ছন্দপতন ঘটেছে। তাই সকালের সৌন্দর্য উপভোগ করার মতো মানসিকতা আজ আর নেই আমাদের। কোকিলের কুহু কুহু ডাক কিংবা ডাহুকের কিচ কিচ শব্দ আজ আর সকাল মাতায় না। একটা অনাগত ভবিষ্যতের দুরাশায় মনপ্রাণ ভারাক্রান্ত সকলেরই।

রবিঠাকুরের কথায় – ‘সকাল সাঁঝে / ধায় যে ওরা নানা কাজে / আমি কেবল বসে আছি, আপন মনে কাঁটা বাছি / পথের মাঝে সকাল সাঁজে / এ পথ বেয়ে / সে আসে, তাই আছি চেয়ে / কতই কাঁটা বাজে পায়ে, কতই ধুলা লাগে গায়ে / মরি লাজে সকাল সাঁজে’।

সংস্কৃত ‘ঊষাকাল’ থেকে  বাংলা ‘সঃকাল’, ‘সক্কাল’, ‘সকাল’ এসেছে। মারাঠি ও ওডিয়াতেও ‘সকাল’ বলে!

অতুলকৃষ্ণ গোস্বামী সম্পাদিত ‘চৈতন্য ভাগবত’ গ্রন্থে লিখেছেন ‘পঢ়িলা ত,  এবে কৃষ্ণ ভজহ সকাল’। বঙ্গসাহিত্য পরিচয় (কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়)তে আছে – ‘তাহা না গণিয়া চাঁদ চলিল সকাল’।

কৃত্তিবাসী রামায়ণে পাই ‘আজিকে সকালে কেন ঘরে আগমন’। ঘনরাম চক্রবর্তী লিখিত ‘ধর্মমঙ্গল’ এ আছে – ‘যে জন ভ্রমণ করি আসিবে সকালে / পারিজাত মালা আমি দিব তার গলে’। ‘শূন্যপুরাণ’এ পাই – ‘পরনাম করিঞা বুলে ফুল লহত সকাল’। ‘বাইশ কবি মনসা’তে রয়েছে – ‘কালীদহের জল মাপি আনহু সকাল’। নবীনচন্দ্রের গ্রন্থাবলীতে আছে – ‘সকালে সকালে যদি না কর বিনাশ … কিছু পরে কার সাধ্য সহিবে নিঃশ্বাস’। কবিকঙ্কন চণ্ডীদাস লিখেছেন – ‘সকালে হানিয়া যাব বিলম্ব না করে’।

স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন – ‘তুমি ডাক দিয়েছো কোন সকালে, কেউ তা জানে না’।

আসলে এরকমটাই হোক, যেখানে আমরা অনায়াসে নজরুলের কথায় বলতে পারি ‘তুমি আমার সকাল বেলার সুর / হৃদয় অলস উদাস করা অশ্রু ভারাতুর / ভোরের তারার মত তোমার সজল চাওয়ায় / ভালোবাসার চেয়ে সে যে কান্না পাওয়ায় / রাত্রি শেষের চাঁদ তুমি গো বিদায় বিধূর’। সকালটা হোক আমাদের সারাদিনের গন্তব্যের মাইলস্টোন। মৃত্যুভয়ে কাতরানো নয়, লড়াই করার শক্তি দিক প্রতিটি শিরা উপশিরা জুড়ে।

আসলে আজ যে পরিস্থিতির শিকার, তা বোধহয় আমাদের কর্মফল। আমরাই আমাদের জীবনটাকে সর্বোচ্চস্তরে উপভোগ্য করে তুলতে বিজ্ঞানের যাবতীয় কারিকুরিকে নিংড়ে ছিবড়ে করে দিতে চেয়েছিলাম। আর তারই জন্য আজ এতো বিপর্যয়। এতো টানাপোড়েন। এতো মানসিক উৎপীড়ন শুরু হয়েছে। বেঁচে থাকাটাই এখন যন্ত্রণা। সকাল হলেই মৃত্যুভারাক্রান্ত হৃদয়ে শুধু প্রহর গোনা। কখন কার ডাক আসে ওপার থেকে! রবিকবির গানে  ‘সকালবেলার আলোয় সাজে বিদায়ব্যাথার ভৈরবী / আন বাঁশি তোর, আয় কবি’।

কিন্তু না। আর নয়। ভয়ে কুঁকড়ে থাকার মানে হয়না আর। আমরা বাঁচতে চাই। আর বেঁচে থাকতে হলে লড়াই করতে হবে। অন্ধকারের বিরুদ্ধে লড়াই।কালোর বিরুদ্ধে লড়াই। চাই একটা সুন্দর সকাল। চাই একটা উজ্জ্বল সকাল। চাই একটা দীপ্তিমান সকাল। আমাদের বাঁচতে হবে। এখনই চলে যাওয়ার সময় আসেনি আমাদের। আমরা কবির কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়ে আজ সকলে বলবই – ‘জোছনার আলো দেখতে চেয়েছি / রাতের ধ্যানে দুঃখ ভুলেছি / ঘুমন্ত এ শহরে দুঃখ বিলিয়েছি / এবার সকাল চাই / একটি নতুন সকাল / একটি নতুন দিনের আলো / যেথা হারিয়ে যাবে সকল অন্ধকার’।

Related Articles

Back to top button
Close