fbpx
অন্যান্যঅফবিটকলকাতাপশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

পরিস্থিতি আলাদা…. করোনা আবহে অক্ষয় তৃতীয়ার চিত্র ম্লানই থাকল এবছর

ভাস্করব্রত পতি, তমলুক: অক্ষয় তৃতীয়া এলেই দোকানে দোকানে দোকানপুজোর ধুম পড়ে। যাঁরা পয়লা বৈশাখের দিন হালখাতা করতে পারেন না, তাঁরা আজকের দিনে লক্ষ্মী গনেশের পুজো সহকারে হালখাতার আয়োজন করে। আমন্ত্রণপত্রে লেখা থাকে ‘শুভ অক্ষয় তৃতীয়া’। অশৌচ অবস্থা থেকে মুক্তি লাভের জন্য গঙ্গাস্নানে ভিড় হয় আজ। ফলহারিণী কালীপুজোয় প্রতিমার মেড় বাঁধার কাজও শুরু হয় আজকেই। এসব তো বাংলার সংস্কৃতি।

বাঙালির সংস্কৃতি। সারা ভারত জুড়েই এদিনটা শ্রদ্ধা সহকারে উদযাপিত হয়। এবছর কিন্তু পরিস্থিতি আলাদা। চারিদিকে কি হয় কি হয় ভাব! দোকান বাজার বন্ধ, উৎসব অনুষ্ঠান বন্ধ, বাড়ি থেকে বাইরে বেরুনোর পথ নেই, মানুষের সাধারণ জনজীবনে প্রভাব পড়েছে তুমুলভাবে। এমতবস্থায় অক্ষয় তৃতীয়া পুরোপুরি ম্লান ভারতবাসীর সাংস্কৃতিক মানচিত্রে।

আজকের দিনেই শ্রীকৃষ্ণ পরশুরাম রূপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাই কোঙ্কন ও মালাবার উপকূলে আজ পরশুরামের পূজার্চনা করার রীতি রয়েছে। ব্যাসদেব এদিনই শুরু করেন মহাভারত লেখার কাজ। আর মহাভারত অনুসারে শ্রীকৃষ্ণ কৌরবদের হাত থেকে দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের মর্যাদা রক্ষা করেছিলেন।

আজকেই সমুদ্রের বুক থেকে জমি উদ্ধার করে ছিলেন এই শ্রীকৃষ্ণ। আজকের পবিত্র দিনেই ত্রেতাযুগের সূত্রপাত। তবে হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে এটি নাকি সত্যযুগের প্রথম দিন। দেবাদিদেব মহাদেবকে তপস্যায় সন্তুষ্ট করলে মহাদেব কুবেরকে অজস্র ধন সম্পদের অধিকারী করে দেন আজকেই। তাই ধনসম্পদের দেবতা হিসেবে আরাধনা করা হয় কুবেরকে। প্রভু ঋষভ নাকি তাঁর এক বছরের উপবাস ভেঙেছিলেন আখের রস খেয়ে। তাই জৈন ধর্মের মানুষজন ঋষভদেবের মূর্তিটিকে এদিন স্নান করান আখের রস দিয়ে।

জীবনের যেকোনও নতুন উদ্যোগের শুভ সূচনার জন্য এই অক্ষয় তৃতীয়াকেই বেছে নিতে চায় সকলেই। এখন অবশ্য সোনা কেনার একটা চল শুরু হয়েছে শুভ প্রাপ্তিযোগ লাভের আশায়। কিন্তু এবার তো সব সোনা দোকান বন্ধ। দোকানের ঝাঁপি খোলার কেউ নেই। ক্রেতাও নেই।
আজ দেবী অন্নপূর্ণার জন্মদিন। মানুষ যাতে সারাবছর খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকে তার জন্য আরাধনা করা হয় দেবীর।

কিন্তু ভারতজুড়ে আজ অসংখ্য নিরন্ন মানুষের হাহাকার। কিন্তু অন্নপূর্ণার দেখা নেই। সূর্যদেব পাণ্ডবদের দান করেছিলেন ‘অক্ষয়পাত্র’। যে পাত্রের খাবার কোনও দিনই শেষ হবে না। হিন্দুরা এইদিনের পুজো করে বিশেষ কারণে। আসলে মৃত্যুর পরে যাতে বৈকুণ্ঠধামে আশ্রয় মেলে। আজকেই পুরীর রথযাত্রার জন্য রথ তৈরির কাজ শুরু হয়। হয়তো রীতি মেনে তা হয়েছে। কিন্তু এবছর রথযাত্রার আয়োজন হবে কিনা কেউ বলতে পারবে না।

দক্ষিণ ভারতের লোকেরা এইদিনে উপোসী থাকেন। শাস্ত্রানুসারে এদিন সোনা, যব, গম, জল ভরা কলস, ফলের রস, দই, ছানার মিষ্টি, ছোলা, চাল, শষ্য ইত্যাদি দান করলে ভালো ফল মেলে। আসলে শ্রীকৃষ্ণ সুদামাকে চিড়ে উপহার দিয়েছিলেন। সেই থেকেই এই উপহার দেওয়ার চল শুরু হয়েছে। অক্ষয় তৃতীয়ার সকালে স্নান সেরে ব্রাম্ভণকে নতুন গামছা, ছাতা, অর্থ, তালপাতার পাখা দান করলে অক্ষয় পূর্ণতা অর্জিত হয়। আজ অবশ্য কেবল স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে অভুক্ত মানুষগুলোর জন্য চাল, ডাল, আলু, সোয়াবিন বিলি করা হচ্ছে গত প্রায় একমাস ধরেই। এঁদের কাছে তাই প্রতিদিনই ‘অক্ষয় তৃতীয়া’।

বৈশাখের শুক্লপক্ষের তৃতীয় দিন হল অক্ষয় তৃতীয়া। এই তিথি কর্মফলের ক্ষয় নাই। অক্ষয়ফলা তৃতীয়া তিথি বিশেষ। একে ‘চিরঞ্জিবি’ তিথিও বলে। আমাদের চিরায়ত সংস্কৃতিগুলো একটু চোখ মেলে দেখলে যে চারটি “আবুজা মুহূর্ত” র খোঁজ পাই, এই অক্ষয় তৃতীয়া তাদেরই একটা। বাকিগুলো হল বসন্ত পঞ্চমী, ভাদলী নবমী এবং দেবউঠানী একাদশী। হিন্দি এলাকায় অক্ষয় তৃতীয়াকে বলে ‘আখা তীজ’ বা ‘অক্ষরতীজ’। হিন্দুদের সাড়ে তিনটি সর্বাধিক শুভ মুহূর্তের অন্যতম এটি। কার্তিকের শুক্লপক্ষের প্রথম দিনটি আধখানা তিথি। অন্য দুটি পূর্ণ তিথি হল পয়লা চৈত্র এবং বিজয়া দশমী।

সারা ভারত জুড়ে এই দিনটিকে মান্যতা দেওয়া হয় কৃষি ও বাণিজ্যের প্রতিভূ হিসেবে। পূর্ব ভারতের ওড়িশা থেকে পশ্চিম ভারতের পাঞ্জাব হরিয়ানা পর্যন্ত কৃষকরা আজকেই লাঙ্গল নিয়ে জমিতে হাল করার কাজ শুরু করে। গুজরাটের চাষিরাও এদিন লাঙলের ফলায় জমিকে বিদ্ধ করে সারা বছর কৃষি সমৃদ্ধির বাসনায়। কিন্তু এবার তো সকলেই গৃহবন্দি। অক্ষয়লাভের উপায় নেই। অক্ষয়ফলা অক্ষয় তৃতীয়া আজ করোনার বিষাক্তফলায় বিদ্ধ হয়ে মরণ যন্ত্রণায় কাতর। আসলে কাতরাচ্ছে ভারতবাসী। কাতরাচ্ছে দেশের অর্থনীতি। কাতরাচ্ছে দেশের মেরুদণ্ড আর প্রবহমান জনজীবন।

১৯৩৬ সালে রেভারেন্ড কে এস ম্যাকডোনাল্ড লিখেছিলেন, ‘হিন্দুদের কাছে এই দিনটি পবিত্র, কারণ শাস্ত্রমতে এই দিন ভিক্ষা ও উপহার দিলে অক্ষয় পুণ্য অর্জিত হয়। ভবিষ্যতে পাপ করলেও সেই পুণ্যফল নষ্ট হয় না। তাই কৃপণরাও হাত উপুড় করে দেন।’ এদিন দান করলে পূণ্য অক্ষয়লাভ হয়। আমরা কি পারি না আজ থেকেই আমাদের পার্শ্ববর্তী দীন দরিদ্র মানুষগুলোর জন্য শ্রীকৃষ্ণের সুদামাকে চিড়ে উপহার দেওয়ার স্মরণে একটু চিড়ে বা অন্য কিছু ওঁদের মুখে তুলে দিয়ে প্রকৃত অক্ষয় তৃতীয়া পালন করতে? তবেই হয়তো অক্ষয় তৃতীয়ার প্রকৃত স্বার্থকতা মিলবে।

Related Articles

Back to top button
Close