fbpx
অন্যান্যঅফবিটগুরুত্বপূর্ণহেডলাইন

তাঁর কবিতায় মানুষের গন্ধ……

মনীষা ভট্টাচার্য: এ লেখা যখন লিখতে বসেছি তখন খবরের কাগজের দুটি হেডলাইন চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে। এক, ‘মসজিদে বিস্ফোরণ, মৃত ২১ বাংলাদেশি’। দুই, ‘বেজিংয়ের হুংকার-এক ইঞ্চি জমিও চিন ছাড়বে না’। এ হেডলাইন নতুন কিছু না। বিস্ফোরণ, সীমান্ত যুদ্ধ – এসব খবরে আমরা অভ্যস্ত। তবু এ হেডলাইন মনে করালো ‘রাজা আসে যায় রাজা বদলায় / নীল জামা গায়, লাল জামা গায়/ এই রাজা আসে, ঐ রাজা যায়/ জামা কাপড়ের রং বদলায়/ দিন বদলায় না।’ বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। জন্ম অবিভক্ত বাংলার ঢাকা জেলার বিক্রমপুরে। তবে স্কুল ও কলেজ জীবন কাটে কলকাতায়। প্রথম জীবনে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামী অনুশীলন দলের সঙ্গে ও পরে বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

কাজী নজরুলকে বই উপহার দিচ্ছেন তরুণ কবি বীরেন্দ্র

এই প্রসঙ্গে তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘জগবন্ধু ইনস্টিটিউশনে ক্লাস সেভেনে পড়ার সময়ে এক বন্ধু একদিন আড়ালে ডেকে বললো- মরতে ভয় পাস? সে বয়সে ও কথার একটাই উত্তর হয়- না। সে পাড়ার দু’একজন নেতার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিল। অনুশীলন দল। দলের ভেতরের কথা সামান্যই জানতাম। দেশ স্বাধীন করতে হবে- এটুকুই বুঝেছিলাম। কাজ বলতে চিঠিপত্র আর খবর পৌঁছে দেওয়া ছাড়া কিছুই করিনি। কিন্তু বয়সের সঙ্গে সঙ্গে নানা প্রশ্ন জাগলো। তাঁদের শিক্ষা ছিল- নাটক নভেল পড়বে না, ধর্মগ্রন্থ পড়বে, মেয়েদের দিকে তাকাবে না, এসব যুক্তিসঙ্গত লাগত না। ছেলেবেলা থেকে বই পড়েছি প্রচুর। বাবার বাক্সভর্তি বই ছিল। ইংরেজি, বাংলা। ক্রমেই দলাদলি ও সংকীর্ণতার আভাস পাচ্ছিলাম। নেতাদের ওপর শ্রদ্ধা থাকছিল না। …তখন ক্লাস টেন-এর ছাত্র। তারপরই দল ছেড়ে দিলাম। দলেরও তখন ভাঙা অবস্থা। আমাকে ধরে রাখার বা শাস্তি দেবার ক্ষমতা তাঁদের ছিল না। সেই সময়েই একবার পাড়ার কিছু বন্ধুর সঙ্গে এক বামপন্থী মিছিলে যোগ দিই। বামপন্থা সম্পর্কে ভাবনার সেই শুরু।

অরবিন্দ চত্রবর্তীকে লেখা কবির অপ্রকািশত চিঠি। সৌজন্যে: অরিজিৎ মৈত্র

আরও পড়ুন: রাজ্যে আত্মঘাতী প্রথম করোনা রোগী, এনআরএসের ওয়ার্ড শৌচালয়ে দেহ উদ্ধার যুবকের

সময়টা ১৯৩৫ সাল মতো।’ এরপর ধীরে ধীরে পার্টির সূত্রেই লেখালিখি শুরু এবং তা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হতেও শুরু করে। এই কবির সঙ্গে আমার পরিচয় তাঁর কবিতার মধ্য দিয়ে। মনে আছে, রবীন্দ্রসদন চত্বরে কোনও এক অনুষ্ঠানে দমদম-এর একটি কবিতার দল ‘দেশ’ কেন্দ্রিক কবিতা কোলাজে বলেছিল ‘রাজা আসে যায়…’। তখনও ব্রততী বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে ‘তিন পাহাড়ের স্বপ্ন’ শোনা হয়নি। রবিবার কবিতার ক্লাসে বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা চাই বলে আবদার করেছিলাম গুরু অমিতাভ বাগচীর কাছে। স্যার দিয়েছিলেন ‘কালোবস্তির পাঁচালী’। চূড়ান্ত ‘অভাব’ সে কবিতায়। শুধু অভাব নয়, সঙ্গে এক বুক ফাটা কষ্ট, খিদের জ্বালা। ভগবানও মুখ ফিরিয়েছেন। ‘…মায়ের কোলে দুধের শিশু, দুধ ছাড়া আজ মরে।’

এই কবিতা প্রসঙ্গে স্যার বলেছিলেন, কলমে যা বেরোয় তার অনেকটাই সত্যি হয় কবিদের জীবনে। চূড়ান্ত অভাবে বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবনও কেটেছে। বহুবার কর্মহীন হয়েছেন। ‘…১৯৪২ থেকে চাকরি শুরু করি আমার দাদারই প্রতিষ্ঠান- ঢাকুরিয়া ব্যাঙ্কিং কর্পোরেশনে।… ১৯৪৮-এ সেই ব্যাঙ্ক ফেল করে। আমিও বেকার হয়ে যাই। প্রায় পাঁচ বছর বেকার ছিলাম। ১৯৪৪-এ বিয়ে করি। …প্রায় চলতো না। ‘ক্রান্তি’ এবং ‘গণবার্তা’য় কিছু কিছু কাজ করতাম। ‘ক্রান্তি’-তে মাসে কুড়ি আর ‘গণবার্তা’ থেকে মাসে চল্লিশ- এটাই নিয়মিত আয় ছিল। ‘পূর্বাশা’য় চাকরি পেলাম তারপর। কিন্তু মাসের শেষে মাইনে আর পাই না। অনেক ঘোরাঘুরির পর একশো টাকা আদায় হল। আর যাইনি’ স্যারের কাছে শুনেছিলাম, দরজায়-দরজায়, গ্রামে গ্রামে ঘুরে নিজের বই বিক্রি করেছেন। বইমেলাতেও দেখা যেত, তিনি নিজের বই নিজেই বিক্রি করছেন। জীবন যাপনে, নিজের আদর্শ, স্বাধীনতা ও সততার প্রতি দায়বদ্ধতায় অন্য কারও সঙ্গে তাঁর মেলেনি। অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বিরল সাহস আর মানুষের প্রতি অনিঃশেষ ভালবাসার জন্য অনেকেই তাঁকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় আর ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

পোশাক বলতে ছিল ধুতি-পাঞ্জাবী আর কাঁধে এক ঝোলা, তাতে বই। আর সেই সব বই থেকেই কখনও উঠে এসেছে, ‘এসো আগুনে হাত রেখে/ আমরা প্রেমের গান গাই।’ কখনওবা, ‘মাটি তো আগুনের মতো হবেই/ যদি তুমি ফসল ফলাতে না জানো/ যদি তুমি বৃষ্টি আনার মন্ত্র ভুলে যাও/ তোমার স্বদেশ তাহলে মরুভূমি।/ যে মানুষ গান গাইতে জানে না/ যখন প্রলয় আসে, সে বোবা ও অন্ধ হয়ে যায়।’ কিংবা ‘আসলে মুখোশ মোটেই বাইরের নয়। বরং ভিতরে/ যাকে আমরা সত্যিকারের মুখ ভাবি/ তেমন কিছুই মানুষের নেই।’ একটা সময় পর তাঁর কবিতার অন্যতম মুখ্য বিষয় হয়ে উঠল দেশ আর মানুষ। ১৯৪৭-এ দেশভাগ, ১৯৫৯-এ খাদ্য আন্দোলন, ’৬১-র নাট্য নিয়ন্ত্রণ বিল-বিরোধী আন্দোলন, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, ’৬৬-র খাদ্য আন্দোলন, ’৬৭-র মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে আইন অমান্য, জেল, জরুরি অবস্থা, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, নকশালবাড়ি—একের পর এক ঘটনা তাঁর কবিতায় মূর্ত হয়ে উঠেছিল। লিখেছিলেন, ‘ছত্রিশ হাজার লাইন কবিতা না লিখে/ যদি আমি মাটিকে জানতাম!’ লিখছিলেন, ‘তোর কি কোনও তুলনা হয়?/ তুই ঘুমের মধ্যে জলভরা মেঘ, জাগরণে জন্মভূমির মাটি।’ আহা! জন্মভূমির মাটির প্রতি আমাদের এমন টান আজ আর কোথায়?

আরও পড়ুন:সেপ্টেম্বরে আরও ৮০ টি বিশেষ ট্রেন, তালিকায় রয়েছে বাংলাও

‘শুধু দুই বেলা দু’টুকরো পোড়া রুটি/পাই যদি তবে সূর্যেরও আগে উঠি’

তিনি মারা গেছেন ৩৫ বছর পেরিয়ে গেল আর জন্ম তাও ১০০ পূর্ণ হল, কিন্তু বদলালো না কিছুই। না মানুষ, না দেশ, না নেতা, না আন্দোলন। উলঙ্গ আজও জামা পেল না, বস্তির শিশুর শরীরের তাপ কমল না আজও, মায়ের চোখের জল শুকিয়ে গেল। তাই তো প্রেমের গান গাইতে গিয়ে গলা থেকে উঠে আসে রক্ত। প্রশ্ন জাগে, স্বদেশ, সময়, মনুষ্যত্ব এগুলি কি এক সুতোয় বাঁধা যায়? কবির সঙ্গে সঙ্গে এ প্রশ্ন বোধহয় যেকোনও স্বহৃদয় মানুষেরই মনে জাগে। তাই কবির ধর্মের পাশাপাশি সেই ব্যক্তিরাও হাঁটেন। প্রশ্ন করেন।

Related Articles

Back to top button
Close