fbpx
ব্লগহেডলাইন

এক শিক্ষকের করোনা যুদ্ধের গল্প

সব্যসাচী ঘোষ, ডুয়ার্স: সোহানা আর আরিয়ানের জন্মদিন। আরিয়ানের মন খারাপ এবছর জন্মদিন পালন হবে না। বাবা তাদের একটি ভিডিও দেখায় যে এই করোনা কবলিত দেশে কিভাবে মানুষের দিন কাটছে না খেয়ে অভাবে। ভিডিও দেখে চোখ ভিজে যায় সোহানা আর আরিয়ানের। ভেজা ভেজা গলায় বাবাকে আবদার জানায়, ‘বাবা জন্মদিনের টাকা দিয়ে ওদের জন্য কিছু করোনা।’ শিশুমনের আবদার শুনে সোহানা আর আরিয়ানের মা তার কাছে জমানো ছেলেমেয়ের জন্মদিনের উপহারের টাকাটা তুলে দেন স্বামীর হাতে। সেই টাকা নিয়ে সোহানা আর আরিয়ানের বাবা পরদিন সকালে ছুটে যান ফালাকাটা দশমীর ঘাটে যেখানে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের জমায়েত হয় যারা দিন মজুরি খেটে সংসার চালান। গিয়ে দেখেন দু-চার জন মানুষ সেদিনও এসেছিলো কিন্তু লকডাউন তাই কাজ নেই হাতে। খালি হাতেই ফিরতে হচ্ছে ঘরে প্রতিদিন।

সন্তানের জন্মদিনের টাকাটা দিয়ে সেদিনের মতো দু-চার জনকে সাহায্য করেন সোহানা আর আরিয়ানের বাবা। কিন্তু লক্ষ্য করেন এভাবে অযাচিত দান নিতে পরিশ্রমী খেটে খাওয়া মানুষরা ইতস্তত বোধ করেন। নিজের এক মাসের বেতনের টাকা দিয়ে শুরু করেন করোনা সচেতনতা প্রশ্নোত্তর প্রতিযোগিতা। রাস্তায় ঘুরে ঘুরে দুঃস্থ হত-দরিদ্র মানুষদের করোনার ওপর প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছেন। প্রশ্নের উত্তর দিলেই মিলছে একটি খামে ভরা আর্থিক উপহার। মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি প্রাইজ দিয়ে তাদের সাহায্য করার এই অভিনব ও মহৎ মানসিকতাই তাকে অনন্য করে তুলেছে সকলের থেকে। কিন্তু সেখানেই থেমে থাকেনি সোহানা-আরিয়ানের বাবার করোনা যুদ্ধ। করোনা মানে মানুষের জন্য কিছু করোনা সন্তানের এই দাবিই যেনো তাড়া করে বেড়ায় তাকে।

আরও পড়ুন: এগরায় যুগলের ঝুলন্ত মৃতদেহ ঘিরে চাঞ্চল্য

তিনি একজন শিক্ষক। একজন পঞ্চায়েত প্রতিনিধি। আবার সমাজের একজন দায়িত্ববান নাগরিকও। করোনার ছোবলে যখন গোটা দুনিয়া গৃহবন্দী তিনিও পারতেন হাত গুটিয়ে পায়ের ওপর পা তুলে বাড়িতে সময় কাটাতে বিশেষ করে যখন তার দু-দুটো ছোট সন্তান রয়েছে বাড়িতে। কিন্তু না সে পথে হাঁটেননি তিনি। করোনা মোকাবিলায় যখন গোটা পৃথিবী ও ভারতবর্ষ লড়াই করছে তিনিও নিজের পাড়া ও শহরের জন্য একজন সৈনিকের মতো মানুষের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। নিজের এলাকার দুঃস্থ মানুষের সাহায্যার্থে পৌঁছে দিচ্ছেন ঔষধ-খাদ্যসামগ্রী, পাড়ায় মহল্লায় স্যানিটাইজেশনের টিম নিয়ে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ঘুরে বেড়াচ্ছেন কাঠফাটা রোদ্দুরে। ফালাকাটা ধূপগুড়ি মোড় বাজারে যাতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে বেচাকিনি চলে তার জন্যও উদ্যোগী হোন তিনি। আবার রেশনে রেশনে ক্রেতারা যাতে ন্যায্য পাওনা বুঝে পায় তার জন্যও লড়াই করছেন সামনে থেকে।

করোনা যুদ্ধে মানুষকে সচেতন করতে সোশ্যাল মিডিয়ার পাশাপাশি বাড়ি বাড়ি থেকে শুরু করে পথে ঘাটে প্রচার অভিযান চালাচ্ছেন। ‘সাজিয়ে দিয়েছি স্নেহের পরশ/ মানুষের মুখে ফোটাতে হরষ’ প্রোগ্রামে সামাজিক দূরত্ব মেনে অভিনব কায়দায় মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন খাদ্যসামগ্রী। তবে সব কিছুকে ছাপিয়ে গিয়েছে তার করোনা ক্যুইজ। মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি প্রাইজ দিয়ে তাদের সাহায্য করার এই অভিনব ও মহৎ মানসিকতাই তাকে অনন্য করে তুলেছে সকলের থেকে। তিনি ফালাকাটা হাই স্কুলের পার্শ্ব-শিক্ষক তথা ফালাকাটা ১নং গ্রাম পঞ্চায়েতের পঞ্চায়েত প্রতিনিধি অভিজিৎ রায়, সকলের প্রিয় সনাতন। সনাতন যে সকলের থেকে আলাদা ও তার চিন্তাভাবনা যে ভিন্ন তা বহু আগেই প্রমাণিত। ফালাকাটার দুগ্গা পূজায় আজ যে অভিনবত্ব তার পায়োনিয়ার এই সনাতনই। করোনা যুদ্ধেও তার অভিনব চিন্তাভাবনা ও প্রয়াস তাকে গোটা সমাজের এক আইকনে পরিণত করেছে। করোনা সংগ্রামে সনাতন মাস্টার একজন সৈনিক যার লড়াইটা শুধুমাত্র পরিবার পরিজনের জন্যই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বাড়ি-পাড়ার গন্ডি পেড়িয়ে ডুয়ার্সের করিডোর ফালাকাটা শহরে তার প্রয়াস এখন বহুল চর্চিত বিষয়।

Related Articles

Back to top button
Close