fbpx
অন্যান্যকলকাতাদেশহেডলাইন

কৃতী হলে কি সম্মান লুপ্ত হয়ে যায়

অরিজিৎ মৈত্র:  শিক্ষার প্রয়োজন কেন? কি কারণে  অক্ষর জ্ঞান দরকার হয়? যতই পড়াশোনা করা হোক না কেন, স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথাগত শিক্ষার পরে সার্টিফিকেটের বড় প্রয়োজন ও তার অপরিসীম মূল্য। কেননা, সেই সব গালভরা সার্টিফিকেট না থাকলে চাকরি, গাড়ি-বাড়ি-র বাস্তব রূপায়ন প্রায় অসম্ভব,অন্তত সৎ উপায়ে ।  আর শিক্ষার পরিসমাপ্তি চরিত্র গঠনে, কথাটার প্রয়োজন বোধহয় সত্যিই নেই। বর্তমানে বাংলার কৃতী ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে ভালো করে মাতৃভাষা বলতে না পারাটাও একটা বিশেষ সার্টিফিকেট। তাদের শিক্ষার মুকুটে তা অন্যতম পালক। এসবের পরেও আছে স্টেটস আর বিলেতের হাতছানি। বড় অর্থে নানান চাকরি আর বিলাসবহুল জীবন। বিয়ের বাজারেও এ হেন পাত্র-পাত্রীদের গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে কোনও প্রশ্নই উঠবে না। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যারিস্টার, চাটার্ড অ্যাকাউটেন্ট আরও কত প্রফেশন। ইঁদুর দৌড়ে অবিরত মেতে থাকা যুবক-যুবতীদের সময় কোথায় জীবনবোধ সম্পর্কে ভাবনা-চিন্তা করার। গর্বিত বাবা-মায়েরা একেবারে  আহ্লাদে আটখানা। কারণ বিদেশে থাকা সন্তানরা লাখ এবং কোটির মধ্যে একজন। এন.আর.আই. তকমা তাদের সারা শরীরে। শহরের অভিজাত এলাকার স্কাইস্ক্র্যাপারে তাদের ফ্ল্যাট। অবশ্য বেশিরভাগ বাবা-মায়েদের ঠিকানার পরিবর্তন হয় সন্তানদের কৃতী হওযার কারণে। তাঁদের ঠাঁই হয় শহরের বা শহরতলীর বৃদ্ধাবাসে। এরপর মৃ্ত্যুর পরে শেষকৃত্যের দায়িত্ব পালন করে বিভিন্ন সংস্থা| কারণ ফার্স্টাক্লাস পাওয়া কৃতীর দল যে নিজেদের পরিবার আর মোটা অরে চাকরি নিয়েই ব্যস্ত। নিজেদের উইকেন্ডে সুবিধা মত বাবা-মায়ের শ্রাদ্ধ সেরে তারাই তাদের ব্যস্ত সময় থেকে কয়েক দিন বের করে নিয়ে দেশে চলে আসেন পৈতৃক ভিটের একটা ব্যবস্থা করতে। শরণাপন্ন হন প্রমোটারমশাইয়ের। সাকশেসন সার্টিফিকেট নিয়ে ছুটতে হয ব্যাঙ্কে। বাবা-মাযের কষ্টার্জিত অর্থের তো একটা সৎ ব্যবহার করতে হবে। না হলে যে স্বর্গত বাবা-মায়েরা মরেও শান্তি পাবেন না।

ড.রাজেন্দ্রপ্রসাদ ও স্কুল পড়ুয়ারা

এত গেল বাব-মার প্রসঙ্গ। এরপর আসি শিক্ষকদের কথায়। ধুতি-পাঞ্জাবী আর মোটা ফ্রেমের চশমা পড়া মাস্টারমসাই স্থান পেয়েছেন ইতিহাসের পাতায়। এখন তাঁদের আসনে জায়গা করে নিয়েছেন স্যার আর ম্যাডামের দল। হাল ফ্যাশানের পোশাক পরিহিত এই সব শিক্ষক-শিক্ষিকারাও কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাঁদের প্রাপ্য সম্মান পান না নিজেদের ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে। স্কুল ফেরৎ শিক্ষিক-শিক্ষিকা এবং ছাত্র-ছাত্রীর দল যদি একই বাসে বা ˆট্রামে বাড়ি ফেরেন, সেক্ষেত্রে নিজেদের আসন থেকে নড়তে দেখা যায়না কৃতী ছাত্রদের। সব ক্ষেত্রেই অবশ্য ব্যতিক্রম রয়েছে। কিন্তু এই ধরনের দৃশ্য চোখে পড়ার একাধিক অভিজ্ঞতা হযেছে আজ পর্যন্ত বহুবার। আবার এরই পাশাপাশি স্কুল-কলেজে ঘটা করে পালিত হয় শিক্ষক দিবস। সব ক্ষেত্রে যে আন্তরিকতার অভাব থাকে, এমন নয়। আবার এসবের সঙ্গে সহাবস্থান করে নবযুবক দলের অন্তসারশূন্যতা। শিক্ষক দিবসের তাৎপর্যতা সম্পর্কে আমরাই বা কতটুকু জানি? অগাধ পাণ্ডিত্বের অধিকারি ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণাণের জন্ম তারিখটা স্মরণে থাকলেও দিনটির তাৎপর্যে গভীরে যাওয়ার সময় কোথায় আমাদের?

প্রাক্তন পুলিশ অধিকারিক অপূর্ব কুমার মৈত্রের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন রাজ্যপাল হরেন্দ্রনাথ মুখ্যোপাধ্যায়

জীবনযাত্রার মধ্যাহ্নে এসে পূর্বাচলের পানে তাকালে নিজের ছাত্রাবস্থার অনেক স্মৃতি মনে আসে। শহরের এক ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ার সময় বাড়িতে আসতেন এক বৃদ্ধ মাস্টাররমশাই।  অনেক চেষ্টা করেও নাম মনে করতে পারলাম না। থাকতেন দক্ষিণ কলকাতার বিবেকানন্দ পার্কে অবস্থিত কেন্দ্রীয় সরকারি আবাসনে। চাকরির থেকে অবসর নেওয়ার পরেও কযেক বছর সেই আবাসনেই ছিলেন। পাইভেট টিউশন করতে বাড়িতে আসতেন। অঙ্ক করাতেন। পড়ায় ফাঁকি দেওয়ার কারণে সেবার এ ফেল করি। এরপরের দৃশ্যের কথা মনে পড়লে আজও চোখে জল আসে। নির্ধারিত বিষয় পাশ করাতে পারেননি বলে তাঁর চোখে জল। মায়ের অনেক অনুরোধ সত্বেও কিছুতেই তাঁর সাম্মানিক বা পারিশ্রমিক নিলেন না। ওই ধরনের মাস্টাররমশাইদের ক্ষেত্রে পারিশ্রমিক শব্দটা ব্যবহার করতে ভদ্রতায় বাধে। কিছুদিন আগে স্যোশাল মিডিয়াতে পড়া ছাত্র এবং শিক্ষকের মধ্যে একটি বিশেষ ঘটনার কথা পড়ে তা সর্বসমক্ষে প্রকাশ করার লোভ সামলাতে পারলাম না।

রবীন্দ্রনাথকে অক্সফোর্ড প্রদত্ত সাম্মানিক ‘ডক্ট্রেট’ প্রদান করতে শান্তিনিকেতনে স্যার মরিস গ্যায়ার ও ড.সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণান

এবার বলি এক সত্যি ঘটনা যার সৌজন্যে আমার বাল্যবন্ধু সাইদত্ত মজুমদার| ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি বাবু রাজেন্দ্রপ্রসাদ একবার কলকাতা সফরে আসছেন। তখন পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল ছিলেন হরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়| রাষ্ট্রপতিকে নিয়ম অনুয়াযী দমদম বিমানবন্দরে হাজির রাজ্যপাল হরেন মুখার্জি। বেশ কিছু্রণ রাষ্ট্রপতির বিমান দমদমের মাটি ছুঁলে প্রটোকল মেনে রাষ্ট্রপতি ড. রাজেন্দ্রপ্রসাদের দিকে এগিযে গেলেন রাজ্যপাল হরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। দেখা গেল রাজ্যপাল করমর্দনের জন্য হাত বাড়িযে দিলেন কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই রাষ্ট্রপতি করমর্দনের পরিবর্তে নত হয়ে রাজ্যপালের পা ছুঁযে প্রণাম করলেন। রাজ্যপাল হরেন্দ্রনাথ মুখার্জি আপ্লুত হয়ে তাঁর প্রিয় ছাত্র রাজেন্দ্রপ্রসাদকে বুকে জড়িয়ে  ধরলেন। বিমানবন্দরে উপস্থিত সঙ্গী, সাংবাদিকরা সেই প্রটোকল ভাঙার দৃশ্য দেখে হতচকিত হয়ে যান। দেশের রাষ্ট্রপতি মাথা নত করছেন একটি রাজ্যের রাজ্যপালের পায়ে। এ দৃশ্য তারা কোনওদিনও দেখেননি। পরে জানা গিয়েছিল হরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় যখন প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক ছিলেন, তখন রাজেন্দ্রপ্রসাদ ছিলেন তাঁর অন্যতম প্রিয় ছাত্র। তাই গুরুকে তাঁর প্রপ্য সম্মানটুকু জানাতে ত্রুটি করেন নি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্রপ্রসাদ।

শিক্ষক দিবসে শিক্ষক-শিক্ষিকা ও বাচ্চাদের সঙ্গে স্ররবপ্ললী রাধাকৃষ্ণান

আজ এই অবক্ষয়ে যুগে প্রত্যেক ছাত্র-ছাত্রীদের জানা উচিত্ তিনি যত বড় উচ্চপদে থাকুন না কেন, শিক্ষকদের সম্মান সবার উপরে। তাঁরাই গড়ে দেন জীবনের মূল ভিত।  জগৎ পরিবর্তনশীল, অনেক কিছুই পাল্টাবে কিন্তু অতীতের মত ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা আর স্নেহের সম্পর্ক গড়ে তুলতে বাধা কোথায়?

Related Articles

Back to top button
Close