fbpx
অন্যান্যপশ্চিমবঙ্গবিজ্ঞান-প্রযুক্তিহেডলাইন

জবার পাপড়িতে দু’ধরনের রং, জিনের খেলা

ভাস্করব্রত পতি, তমলুক: প্রকৃতির খেলা কে বুঝিতে পারে? অবশ্য প্রকৃতির খেলা বুঝতে শুধু চোখে দেখলেই হবে না, তাকে বিজ্ঞানসম্মত যুক্তি সহকারে উপস্থাপন করতে হবে। আর তবেই সেটা হবে সঠিক বিজ্ঞানের চর্চা।

কয়েকদিন আগে গড়বেতা কলেজের অধ্যক্ষ তথা বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ামক ড. হরিপ্রসাদ সরকার তাঁর মেদিনীপুর শহরের হবিবপুরের বাড়ির বাগানের জবা গাছে লক্ষ্য করেন একই জবা ফুলের পাঁপড়িতে দুরকম রঙের আর্বিভাব।
ড. সরকার ৬ – ৭ বছর আগে তাঁর এক বন্ধুর বাড়ি থেকে ডাল নিয়ে এসে জবা গাছটি লাগিয়ে ছিলেন। সেখানে আগে একরঙা হলদেটে জবা ফুল ফুটলেও, তিনি হঠাৎ করে লক্ষ্য করলেন সেই এক রকম ভাবে ফুটতে থাকা ফুলে দুইরকম রঙের আর্বিভাব।
এরপরই বিষয়টির কারণ জানতে তিনি শরণাপন্ন হলেন বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক উদ্ভিদবিজ্ঞানী ড. অমলকুমার মন্ডলের। অমলবাবু বিষয়টির বৈজ্ঞানিক কার্যকারণ খুঁজতে শুরু করেন। অমলবাবুর মতে শঙ্কর প্রজাতির গাছের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা ঘটে থাকে। গাছের কলম করার ক্ষেত্রেও এরকম ঘটে। যেমন গোলাপের একটা ডালে লাল, অন্য ডালে হলুদ, গোলাপি নানান রঙের খেলা ইচ্ছে মতে করা যায়। এই নিয়ে বহুদেশ নানাভাবে বাণিজ্যিক রোজগারের পথ প্রস্তুত করেছে।

আরও পড়ুন:“মমতা দিদি ভয় পেয়েছেন, ইয়ে ডর আচ্ছা হ্যায়” মুখ্যমন্ত্রীকে কড়া ভাষায় আক্রমণ তেজস্বীর

কিন্তু এই জবাগাছটির ক্ষেত্রে বিষয়টি একটু আলাদা, ৫-৬ বছর ধরে স্বাভাবিকভাবে এক রঙে ফুল দিতে দিতে এই বছরই একটা ফুলের দুরকম রঙের পাঁপড়ির আর্বিভাব ঘটেছে। অমলবাবুর মতে, এই ঘটনার পিছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। প্রথম যে কারণটা মনে হচ্ছে, তা হল উদ্ভিদের যে নানান রঙের বাহার বৈচিত্র্য দেখা যায় সেটা ক্রোমোফোর নামক রঞ্জকের কারণে হয়। যেটা আবার ক্লোরোপ্লাস্টের ক্রমবর্ধমান এবং ক্রমহ্রাসমানতার তারতম্যের উপর নির্ভরশীল। পরিবেশের আমুল পরিবর্তনও আর একটা কারন হতে পারে। একটা ফুলের দুটো পাঁপড়ি হঠাৎ করে একটু হলদেটে বেশি দেখা গেল, মানেই হচ্ছে ফুলটির স্বাভাবিক যে রঙ বাকি পাঁপড়িগুলিতে ঠিক আছে। শুধু হেরফেরটা ঘটেছে অন্য দুটি পাঁপড়িতে এবং একটা অদ্ভুত ফুলের সৃষ্টি হয়েছে।
অন্য আর যে সম্ভাব্য কারণ মনে হচ্ছে তা হল, “জিনের খেলা”! প্রতিটি জীবের প্রতিটি বৈশিষ্ট্যকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য রয়েছে জিনের প্রভাব বা বলা ভালো জিনের দায়ভার রয়েছে। যা কোষের নিউক্লিয়াসের উপর অবস্থান করে। জন্মানো থেকে মৃত্যু মানে গাছের বীজের অঙ্কুরোদগম থেকে সেনেসেন্স অর্থাৎ ঝরে যাওয়া পর্যন্ত এমন কি কখন ফুল ফুটবে, কোন ফুলের কি রঙ হবে, কি গন্ধ হবে সবটাই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে জিনের।

এই জিন খালি চোখে দেখা সম্ভব নয়। ইলেকট্রন মাইক্রোসকোপের দ্বারা দেখা যায়। যেকোনও গাছে ফুলের রঙের নিয়ন্ত্রণের জন্য জিনকে দায়ী করা হয়েছে। উদ্ভিদের শরীরে প্রত্যেকটি জিনের হঠাৎ করে পরিবর্তন হয়ে যাবার অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে। তাও আবার বিভিন্ন কারণের জন্য হয়ে থাকে। অনেক কারণের মধ্যে পরিবেশের নানাবিধ পরিবর্তনও একটা প্রধান কারণ। যার ফলে নতুন প্রজাতির সৃষ্টি হচ্ছে। নতুন নতুন চরিত্রের সৃষ্টি হচ্ছে প্রতিনিয়ত। কখনও সেটা চোখে ধরা পড়ে, আবার কখনো চোখের আড়ালেই থেকে যায়। এই ঘটনাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘মিউটেশান’ বা ‘পরিব্যাপ্তি’।

এই ফুলের রঙের যে পরিবর্তন হঠাৎ করে পরিলক্ষিত হল, এটাও অভিব্যাক্তির ফলেই ঘটেছে বলে মত প্রকাশ করেন বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ ও বনবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. অমলকুমার মন্ডল। আসলে যে চরিত্রটি প্রকাশিত হয় তাকে ‘ডোমিনেন্ট চরিত্র’ আর যেটা অপ্রকাশিত থাকে সেই চরিত্রটাকে সুপ্ত বা ‘রিসেসিভ চরিত্র’ বলে। সন্ধ্যামণি উদ্ভিদেও এই রকম আজব কান্ডকারখানা দেখা যায়। পিটুনিয়া উদ্ভিদের ক্ষেত্রেও দেখা যায় এরকম।

আরও পড়ুন:করোনা হঠাতে দেশজুড়ে বৃহত্তর প্রচারাভিযানের সিদ্ধান্ত মোদি সরকারের, আমজনতাকে অংশ নেওয়ার আহ্বান

উদ্ভিদের এই প্রকট এবং প্রচ্ছন্নতায় যে জিনের প্রভাব রয়েছে সেটা বিভেদ না থাকায় এমন ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে মনে করেন। এই ধনের ঘটনাকে বলা হয় ‘ইনকম্পপ্লিট কো ডোমিনেন্স’। যার ফলে সব রঙের প্রকাশ ঘটেছে বলে মনে করা হচ্ছে। এই ঘটনা সন্ধ্যামণি উদ্ভিদে সব চেয়ে বেশি দেখা যায়। জবাতে প্রায় দেখা যায় না বললেই হয়, কিন্তু তবুও দেখা দিল এবার।
জীবজগতের গতিবিধির সবটাই ভিতরে ভিতরে প্রতিনিয়ত নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে ‘জিন’। বিজ্ঞানের এক যুগান্তকারী আবিষ্কার হল ‘জিন’ এবং তার কার্যক্রম। এমনকি কোনদিন বাদলা হলে উদ্ভিদের খাদ্য তৈরিতে সূর্যের অনুপস্থিতির জন্য কি ভাবে অন্য উপায়ে খাদ্য তৈরি করতে হবে তারও সঠিক সময়ে সঠিক সিগন্যাল পাঠিয়ে কার্যক্রম সমাধা করাও জিনের খেলা। অনেকটা সেই কিশোরের কুমারের গানের কলির মতো ‘প্রেমের খেলা কে বুঝিতে পারে, বুঝবে যে জন প্রেম রোগেতে, ধরেছে গো যাঁরে “।

Related Articles

Back to top button
Close