fbpx
কলকাতাগুরুত্বপূর্ণপশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

এভাবেও শুরু করা যায়… সেটাই দেখিয়েছিলেন ডা. বিধানচন্দ্র রায়

ডাক্তারি পড়ার ইচ্ছে ছিল না...কলকাতার রাস্তায় ট্যাক্সি চালাতেন ডা. বিধানচন্দ্র রায়

যুগশঙ্খ ডিজিটাল ডেস্ক: ডাক্তারি পড়ার কোনও ইচ্ছে ছিল না, তাও তিনি ছিলেন প্রবাদপ্রতীম চিকিৎসক। আজও মানুষ তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি এক কিংবদন্তি চিকিৎসক হিসেবে ডা. বিধানচন্দ্র রায়কে মনে রেখেছে। কিন্তু এই স্বনামধন্য চিকিৎসক কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের এমবিএ পরীক্ষায় ফেল করেছিলেন। আবার তিনিই মাত্র ১২০০ টাকা সম্বল করে বিলেত গিয়ে দু’বছরে মেডিসিন ও সার্জারির চূড়ান্ত সম্মান এম আর সি পি এবং এফ আর সি এস প্রায় একই সঙ্গে অর্জন করেছিলেন।

বিহারের পটনার বাঁকীপুরে ১৮৮২ সালে ১ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন বিধানচন্দ্র রায়৷ সেখানে এন্ট্রান্স পাশ করার পর তিনি আই এ পড়তে আসেন কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে। এরপর অঙ্কে অনার্স নিয়ে বিএ পাশ করেন পাটনা কলেজ থেকে।

যশোহরের রাজা প্রতাপাদিত্য, যিনি বিখ্যাত বারো ভুঁইঞার একজন ছিলেন, বিধানচন্দ্র রায়ের সেই পরিবারের সদস্য। ব্রাহ্ম পরিবারের সন্তান ছিলেন তিনি। তাঁর বাবা ছিলেন সরকারি অফিসার ।

ডা. রায়, সেই বিরল প্রতিভা যিনি ডাক্তার হিসাবে এফ.আর.সি.এস এবং এম.আর.সি.পি-এই দু’টি ডিগ্রীই অর্জন করেছিলেন মাত্র দুই বছর তিন মাস সময়কালের মধ্যেই। বিধানচন্দ্র রায়ের ঠাকুমা তাঁর নাম রেখেছিলেন ভজন।

তবে ক্যারিয়ার শুরুটা হয়েছিল নিদারুণ অর্থাভাবে। একটা সময় কলকাতার রাজপথে পার্টটাইম ট্যাক্সি চালিয়ে ছিলেন বিধানচন্দ্র রায়। কোনওদিন চিকিৎসক হতে চাননি ডা. বিধানচন্দ্র রায় । শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং এবং কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ফর্মের জন্য আবেদন করেছিলেন বিধানচন্দ্র রায়। কিন্তু আগে এসে যায় ডাক্তারির ফর্ম। সেই ফর্ম পূরণ করে পাঠিয়ে দেন তিনি। পরে শিবপুরের ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ফর্ম আসায় আর আবেদন করলেন না। চিকিৎসক না হয়ে ইঞ্জিনিয়ার হলে আজ হয়তো অন্যভাবে ইতিহাসে লেখা হত বিধানচন্দ্র রায়ের নাম। প্রবল অর্থাভাবে সঙ্গে লড়াই করে তাঁর বড় হয়ে ওঠা। থাকতেন কলেজ স্ট্রিট ওয়াই এম সি এ-তে।
চিওরঞ্জন দাশের উৎসাহেই তিনি ১৯২০-এর দশকের প্রথম ভাগে বাংলার রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।

১৯২৩ সালের নির্বাচনে ব্যারাকপুর মিউনিসিপ্যাল নির্বাচনী এলাকা থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তিনি সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জিকে পরাজিত করেন। ১৯২৫ সালে তিনি স্বরাজ পার্টিতে যোগ দেন এবং সিআর দাশের মৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে গঠিত ট্রাস্ট ফান্ডের ট্রাস্টি নিযুক্ত হন। এর পর থেকেই ডাক্তার রায় নিজেকে জাতীয় রাজনীতিতে জড়িয়ে ফেলেন। তিনি মহাত্মা গান্ধীর মাঝে তাঁর দ্বিতীয় গুরু খুঁজে পান।
১৯৩০-এর দশকে তিনি কলকাতা কর্পোরশনের রাজনীতিতে যোগ দেন এবং ১৯৩১ ও ১৯৩২-এ দুবার মেয়র নির্বাচিত হন।

তিনি ভারতীয় মেডিক্যাল কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো মনোনীত করা হয়। এবং কলকাতা কর্পোরেশনে অল্ডারম্যান (Alderman) নির্বাচিত হন।
যুদ্ধচলাকালে ভারতীয় সরকার আর্মি মেডিক্যাল কোর গঠনের জন্য বিধানচন্দ্রের সহযোগিতা প্রার্থনা করলে ১৯৪২ সালে গান্ধীর সম্মতি নিয়ে তিনি এ দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেই বছরই তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর পদে নিযুক্ত হন। ১৯৪৩ সালে গান্ধী তাঁর অনশন শুরু করলে তিনি স্বেচ্ছায় এই নেতার শারীরিক অবস্থা তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নেন। পরর্বতী বছর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় রায়কে ‘Doctor of Science’ সম্মানে ভূষিত করে।

স্বাধীন ভারতে তিনি যুক্তপ্রদেশের গভর্নর মনোনীত হন। কিন্তু স্বাস্থ্য সংক্রান্ত কারণে তিনি এ পদ থেকে ইস্তফা দেন। ১৯৪৮ সালে পশ্চিমবাংলায় প্রফুল্ল ঘোষের মন্ত্রিসভা ভেঙে গেলে তিনি প্রাদেশিক কংগ্রেসের প্রধান নির্বাচিত হন এবং তাঁকে পশ্চিম বাংলা সরকারের দায়িত্ব নিতে হয়। ১৯৫২ সালে তিনি দ্বিতীয় বারের মতো মুখ্যমন্ত্রী নিযুক্ত হন।

১৯৫৭ সালের নির্বাচনে তিনি তৃতীয় বারের মতো মুখ্যমন্ত্রী হন। তাঁরই উদ্যোগে ভারত সরকার ‘দন্ডকারণ্য’-এ শরণার্থী পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়। বিধানচন্দ্র রায়ের জীবন পর্যালোচনা করলে কিন্তু দেখা যায়, আজ যে আধুনিক বাংলায় বসবাস করি সেটা কিন্তু বিধানবাবুর নিজের তৈরি। তা কলকাতা বন্দর হোক, লবণহ্রদ বা কল্যাণীর মতো উপনগরী হোক, দুর্গাপুর-আসানসোলের মতো শিল্পাঞ্চল হোক, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে কলকাতার বিমান সংযোগ হোক, সব কিছুরই স্থপতি বিধানচন্দ্র রায়।

বিধানচন্দ্র রায় তখন বাংলার মুখমন্ত্রী আর বিরোধী দলনেতা জ্যোতি বসু, একটা বিল পাশ করা নিয়ে বিধানসভায় তুমুল তর্কবিতর্ক চলছে। সেই সময় বিধানচন্দ্র রায় বিধানসভায় রায় বক্তৃতা দিচ্ছেন, সেই সময় মাঝ পথে জ্যোতি বসু দাঁড়িয়ে উঠে বিধানচন্দ্র রায়ের উদ্দেশ্যে বলেন, “আপনি তো হিটলারের মতো কথা বলছেন”মুচকি হেসে বললেন ঠিক তাই, হিটলার স্টালিনের সঙ্গে কথা বলছে। এমনই ছিল মুখ্যমন্ত্রী আর বিরোধী দলনেতার সম্পর্ক।

প্রথম বাঙালি হিসেবে ভারতরত্ন পেয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায় ১৯৬১ সালে। তাঁর পেশা ডাক্তারি হলেও, ওঁনার অবদান শিক্ষা, সমাজসেবা, এবং রাজনীতিতে অপরিসীম। সেইজন্য তাঁকে পশ্চিমবঙ্গের রূপকার নামে অভিহিত করা হয়। তাঁর জন্মদিন ১ জুলাই ভারতে জাতীয় চিকিৎসক দিবস হিসেবে পালিত হয়।

Related Articles

Back to top button
Close