fbpx
অন্যান্যঅফবিটহেডলাইন

জামাইষষ্ঠী বা অরণ্যষষ্ঠীর কিছু কথা

ভাস্করব্রত পতি, তমলুক : আজ জামাইষষ্ঠী। সংস্কৃত শব্দ ‘জামাতা’ থেকে প্রাকৃত ‘জামাউ’ হয়ে বাংলায় এসেছে ‘জামাই’ বা ‘জামাঞি’। হিন্দিতে ও গুজরাটিতে ‘জমাঈ’, মারাঠিতে ‘জারঈ’, মৈথিলীতে ‘জামায়’ ও ‘জমাঈ’, ওড়িয়াতে ‘জ্বাই’ ও ‘জুআঁই’ , ফারসীতে ‘দামাদ’ এবং সিন্ধীতে ‘জাটো’ বলে।

 

 

মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যেও ‘জামাই’ শব্দের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। মনসামঙ্গলে আছে ‘বেহুলার জামাই’, শিবায়ণে আছে ‘কুরণ্ডো জামাই’ এবং দ্বিজ বংশীদাসের ‘বিষহরি ও পদ্মাবতীর পাঁচালি’তে আছে ‘কালীর জামাই’। দীনবন্ধু মিত্রের ‘জামাইবারিক’ এ আছে ‘ভগবতী, তোমার যম জামাই দুই উপস্থিত’।

 

 

পশ্চিম রাঢ়ে এই জামাইষষ্ঠীকে বলে “জামাইবাঁধনা”। এখানে জামাইষষ্ঠী হয় কালীপুজোর পরে ভাইফোঁটার সাথে। আর জামাইষষ্ঠী মানেই নাকি জামাইদের কামাই করার অনুষ্ঠান! জামাইদের জীবনের দুর্গাপূজা যেন ! চব্য চোষ্য লেহ্য পেয় খাবারের সাথে সাথে উপঢৌকন জোটে ভালো মতোই ! মেয়ের দাম্পত্যজীবনে সুখ শান্তি আনতে শ্বশুর শাশুড়ির এদিনটায় দম ফেলার সময় থাকেনা। ড. মিহির চৌধুরী কামিল্যার কথায় – “এ হলো উর্বরতা বা ফার্টিলিটি তত্ব । কিন্তু তা-ই কালক্রমে রূপ নিয়েছে জামাইয়ের প্রাপ্তিযোগে । ফলে অফিসে অফিসে এদিন অলিখিত লিখিত ছুটির বন্যা”! যদিও এবছর ছুটি আর ছুটি! কিন্তু লক ডাউনে ঘরবন্দী সবাই।

 

 

বাঙালী সংস্কৃতিতে ষষ্ঠীপূজা এক অতুলনীয় লোকাচার। অশোকষষ্ঠী , আতুরষষ্ঠী , অন্নষষ্ঠী , লোটনষষ্ঠী , কোড়াষষ্ঠী , একশ্যাষষ্ঠী , অরণ্যষষ্ঠী , কদলীষষ্ঠী , চাপড়াষষ্ঠী, কার্দমীষষ্ঠী, ছয়ষষ্ঠী, মূলাষষ্ঠী, স্কন্ধষষ্ঠী, সূর্যষষ্ঠী, সেটেরাষষ্ঠী, শীতলষষ্ঠী , ষাটষষ্ঠী, লুন্ঠনষষ্ঠী, চন্দ্রষষ্ঠী, গোষষ্ঠী , জলষষ্ঠী , দুর্গাষষ্ঠী, মাগোষ্ঠষষ্ঠী, চম্পাষষ্ঠী, চান্দনীষষ্ঠী, গোঠষষ্ঠী, জামাইষষ্ঠী, হলষষ্ঠী , সূতিকাষষ্ঠী, নারীষষ্ঠী, ধূলাষষ্ঠী, নীলষষ্ঠী, হলষষ্ঠী, পাটাইষষ্ঠী, মন্থনষষ্ঠী, বোধনষষ্ঠী, বিবাহষষ্ঠী, মাথানষষ্ঠী, কৃষ্ণষষ্ঠী ইত্যাদি। তবে এদের মধ্যে অরণ্যষষ্ঠী বা জামাইষষ্ঠী একটু অন্যরকম। একটু যেন পরিবেশ প্রীতির ছোঁয়া পাওয়া যায় এখানে।

 

 

অরণ্যষষ্ঠীর ব্রতে বাড়ির সকলের মঙ্গল কামনা করা হয়। গরু বাছুর , পশুপাখি , ঝি চাকর , ছেলে মেয়ে , আত্মীয় স্বজন, বউ , জামাই — সকলের। ড. শীলা বসাক এই ব্রতের একটি ছড়া উল্লেখ ক’রেছেন — “জৈষ্ঠ্যমাসে অরণ্য ষাট / ফিরে ঘুরে এলো ষাট / বার মাসে তের ষাট / ষাট ষাট ষাট / ঝি চাকরের ষাট / গোরু বাছুরের ষাট / কর্তার ষাট , ছেলেমেয়ের ষাট / বউ ঝিয়ে ষাট, নাতিনাতনির ষাট / ষাট ষাট ষাট”।
তবে অরণ্যষষ্ঠীর ব্রতে বেশকিছু বাধানিষেধ আছে। মূলতঃ সন্তান ও জামাইয়ের সুখ সমৃদ্ধির কামনায় এই ব্রত। যিনি ব্রতী তিনি সধবা হবেন। আইবুড়ো বা বন্ধ্যা নারীদের নেওয়া হবে না। আর এই ব্রত পালন করতে করতে ছেড়ে দিলে সেই নারী রাক্ষসী সদৃশ হয়ে যায় বলে বিশ্বাস। তবে ব্রতীকে নিরামিষ খেতে হয়। কৃষ্ণরাম দাস লিখেছেন — “অদ্য যে অরণ্যষষ্ঠী বিদিত সংসার / আমিষ ভোজন কর দেখি কদাকার”।

 

 

অরণ্যষষ্ঠীর ধ্যানমন্ত্র হল “দ্বিভূজাং হেম গৌরাঙ্গীং রত্নালঙ্কার ভূষিতাং / বরদা ভয় হস্তাঞ্চ , শরচ্চন্দ্র নিভাননাং // পট্টবস্ত্র পরিধানং পীনোন্নত পয়োধরাং / অঙ্কার্পিত সুতাং ষষ্ঠী মম্বজস্থাং বিচিন্তয়েৎ”।
ব্রত আচার – জৈষ্ঠ্যর শুক্লা ষষ্ঠীতে পিটুলি দিয়ে কালো বেড়াল ও কঙ্কন তৈরি করে নানা ফল দিয়ে বাটা সাজানো হবে প্রথমে। ৭ টি পান , ৬ টি সুপারি , বাঁশপাতা হলুদে ছোপানো নেকড়ায় জড়িয়ে ৬ টি হলুদে ছোপানো সূতোয় বাঁধা হবে। একে বলে “ষাট সূতা”।

 

 

এবার ষষ্ঠীতলায় বা অশ্বত্থ গাছের গোড়ায় তেল হলুদ দিয়ে পূজো ক’রতে হবে ষষ্ঠীর। ঐ গাছেও সূতা জড়িয়ে দিতে হবে। পূজার শেষে সেই হলুদ ছেলে মেয়ে জামাইয়ের কপালে ছুঁইয়ে ডানহাতে ষাট সূতা বেঁধে দিতে হবে। ওড়িশায় জামাইষষ্ঠী পালিত হয় কার্তিক মাসে। পুরুলিয়ার আদিবাসী মহিলারা অরণ্যষষ্ঠী ব্রত পালন করেন সন্তানের মঙ্গল কামনায়। এই ব্রত হোলো আদিম সমাজের আচরণজাত উর্বরতা ও প্রজননশক্তিবৃদ্ধির কামনা।

Related Articles

Back to top button
Close