fbpx
অন্যান্যঅফবিটব্লগহেডলাইন

শুধু মন্ত্রী নন মানবিকতায় উদার প্রণব…

সুনীল মিত্র: প্রণব মুখার্জ্জি ২০০৯ সালে অর্থমন্ত্রী পি চিদাম্বরমের কাছ থেকে অর্থদফতরের দায়িত্ব নিলেন। ২০০৯-২০১১ সাল পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে আমার কাজ করার অভিজ্ঞতা অসাধারণ। ওই সময় তিনি শুধু অর্থমন্ত্রীত্ব নয়, প্রায় ৬০টি ‘গ্রুপ অব মিনিস্টার’(জিওএম) এর মাথায় তাঁকে বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেই সময় যেকোনও সমস্যা দেখা দিলেই, সমাধানে তাঁকে চেয়ারম্যান করে একটা জিওএম তৈরি করে দেওয়া হত। ওই সময়ে অর্থদফতরে, বিশেষ করে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী সংস্কারের দিকে পদক্ষেপ করা হয়। প্রত্যক্ষ ও অপ্রত্যক্ষ কর ব্যবস্থার সরলীকরণের জন্য ইনকামট্যাক্স, সার্ভিসট্যাক্স, এক্সাইজ ডিউটি সব ক্ষেত্রেই করদাতাদের যথাসম্ভব দফতরের আধিকারিকদের থেকে দূরে রাখার জন্য বাৎসরিক বা নিয়মিত ব্যবধানে হিসাব (রিটার্ন) দাখিল করার জন্য ই-ফাইলিং-এর ব্যবস্থা।

 

 

সাতের দশকে প্রণববাবু অর্থদপ্তরেরই প্রতিমন্ত্রী থাকার সুবাদে মন্ত্রীসভার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের খুঁটিনাটি, অন্ধি-সন্ধি সব জানতেন। এইসব দফতরগুলিতে এটা প্রায় স্বতঃসিদ্ধ ছিল যে কোনও বছরের ক্লিয়ারেন্স নিতে বা রিফান্ড পেতে ১০%-২৫% দফতরের খরচ করতে হতো। করদাতারাও ঝামেলা এড়াতে বাকি টাকাটা হাতে পেতে ওই পরিমাণ ত্যাগ করতে বাধ্য হতেন। সেই ব্যবস্থার জাল থেকে করদাতাদের মুক্তি দিতে ইনফোসিসকে দিয়ে, সঙ্গে দফতরের ২০-২৫ জন প্রতিভাবান আধিকারিকদের যুক্ত করে দিন-রাত কাজ করার পর ২০১০-এ শুরু হল রিটার্নের ই-ফাইলিং। আজ সেই ব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে উন্নত হতে হতে এখন অনেক সহজ হয়েছে। এখন অনেকেই অন্য কারোর সাহায্য ছাড়াই রিটার্ন দাখিল করতে পারছেন এবং দ্রুত রিফান্ড পেয়েও যাচ্ছেন। এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য করদাতাকে তাঁর রোজগার সঠিকভাবে নিজেকেই ঘোষণা করার সুযোগ করে দেওয়া। এর মাধ্যমে করদাতাকে যেন যথাযোগ্য সম্মান দেওয়া হয়, তেমনি দ্রুত রিফান্ড পাইয়ে দেওয়ার মধ্যে রয়েছে সরকারে প্রতি আস্থা সৃষ্টি করার প্রচেষ্টা। প্রথমে কাস্টমস রাজি না হলেও পরবর্তী পর্যায়ে সেখানেও ই-রিটার্ন চালু হয়েছে। এই জমা দেওয়া রিটার্নের মধ্যে ১%-৫% যদিও পরে দপ্তরে স্ক্রুটিনি করা হয় কিন্তু সেজন্য অন্যান্যদের রিফান্ড আটকে থাকে না। রিটার্নের ক্লিয়ারেন্স জমা দেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই করদাতার হাতে এসে যায়। এক কথায় প্রণববাবুর হাত ধরে কর ব্যবস্থায় একটা ঐতিহাসিক সংস্কার এলো যার সুবিধা আপামর করদাতারা পাচ্ছেন। তাঁর সময়েই জিএসটি ব্যবস্থার নিয়মাবলী তৈরির কাজ অনেকটা এগিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত চালু করা হয়নি ইউপিএ সরকারের পতন ও বিজেপি সরকার দিল্লি তখতে এসে যাওয়ায়।

 

 

প্রণববাবু নিজের দফতর ছাড়াও অন্যান্য নানা দফতরের নানা সমস্যা সমাধান করতে দিনে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতেন নির্বিবাদে। দলের এবং বিরোধীদের কাছে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি। তিনি যখন সংসদে বক্তব্য রাখতেন তখন বিরোধীদল বিজেপি-র যশোবন্ত সিনহা, মূরলী মনোহর যোশী, এল কে আদবানী, সুষমা স্বরাজ সহ অন্যান্য দলের শীর্ষ নেতারা মনোযোগ সহকারে তাঁর কথা শুনতেন এবং তাঁকে সম্মান করতেন। পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তো ছোটবোনের মতো দেখতেন। উনিও তাঁকে সব সময় দাদার সম্মানই দিয়েছেন। এমন একজন প্রবীণ মন্ত্রী হওয়া সত্বেও বিভাগীয় সচীবের ব্যাখ্যার প্রেক্ষিতে ফাইলে তাঁর নেওয়া সিদ্ধান্ত বদলাতে পিছপা হতেন না। সবচেয়ে বড় কথা সচীবের প্রতি আস্থা এবং সম্মান দেখানোর মতো উদারতা তিনি বারবার দেখিয়েছেন।

যদিও একান্তই ব্যক্তিগত, কিন্তু আমার পরিবার ভিন্ন জায়গায় থাকার কারণে স্বাভাবিক কিছু অসুবিধে তো ছিলোই। সে অসুবিধা দূর করে পরিবারে সঙ্গে দেখা করার সুযোগ করে দিতে তিনি আমাকে তাঁর জন্য নির্দিষ্ট প্রতিরক্ষা বিমানে একই সঙ্গে যাতায়াতের অনুমতি দিয়েছেন বেশ কয়েকবার। সরকারি আদব-কায়দার বাইরে তাঁর ব্যবহার, তাঁর চরিত্রের অন্য একটা দিক উন্মোচিত করে। সেটা মানবিকতার। সত্যিই অসাধারণ।

Related Articles

Back to top button
Close