fbpx
অন্যান্যঅফবিটকলকাতাপশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

রাত পোহালে বিশ্বকর্মাপুজোর প্রাক্কালে আজ বাংলার বিশ্বকর্মা

নীলোৎপল বন্দ্যোপাধ্যায়: আকাশে সূর্য যেদিন সিংহরাশি থেকে কন্যা রাশিতে প্রবেশ করেন, সেইদিনটিতেই আমাদের বাংলায় পালিত হয় বিশ্বকর্মাপুজো ও অরন্ধন। পূর্ব ও মধ্য বাংলায় বিশ্বকর্মাপুজো এবং পশ্চিমবাংলায় মূলত উচ্চশ্রেণির ঘরে অরন্ধন। এর সঙ্গে সাঁওতাল এবং আদিবাসীদের করমপুজোও এই একই দিনে।

ময়মনসিংহের হলুদ গায়ের রঙের বিশ্বকর্মা। নারায়ণচন্দ্র সূত্রধরের বর্ণনার সঙ্গে গেছে।

এই পুজো মূলত কর্মী শ্রেণির পুজো। আদিকাল থেকে এটি যন্ত্র, আক্ষরিক অর্থেই যন্ত্রে এই পুজো হয়ে এসেছে। বিশ্বকর্মার মূর্তি গড়ে পুজো খুবই অল্পদিনের বলা ভালো। সে কারণে বিশ্বকর্মার কোনও নিজস্ব মুখের আদলও গড়ে ওঠেনি। উত্তর ভারতে যেখানে তিনি চারমুখ বিশিষ্ট ও সাদা দাড়ি গোঁফ নিয়ে পুজো পান, বাংলায় সেই তিনিই কার্তিকের যমজ ভাইয়ের মতন চেহারা নিয়ে প্যাণ্ডেলে প্যাণ্ডেলে পুজো পেয়ে থাকেন। এই সংক্রান্তিটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ ১৭ সেপ্টেম্বর সূর্য কন্যারাশিতে প্রবেশ করার পর ২২/২৩ সেপ্টেম্বর দিন-রাত্রি সমান হয়ে রাত্রির দৈর্ঘ্য বাড়তে থাকে। বছরের বারোটি সংক্রান্তিতেই ব্রত উপবাসের বিধি রয়েছে, তবে পশ্চিমবাংলায় এই দিনটিকে রান্নাপুজোর দিন হিসেবে মানা হয়।

এদিন উনুন জ্বালানো হয় না, উনুনকে বিশ্রাম দিয়ে তাকে নতুন মাটি দিয়ে নিকোনো হয়, লেপে পুঁছে আলপনা দিয়ে সাজানো হয়। আর আগেরদিন রাতে সব মহিলারা নিজেদের সব সেরা রান্নাটি করে থাকেন। তারপর উনুনের চারপাশে সেইসব রান্না সাজিয়ে রেখে ব্রতকথা পাঠ করেন। আজকাল শহুরে কালচারে, চা-মোদি লোকজন ফ্লাস্কে করে আগের রাতে চা-ও বানিয়ে রাখেন, এমনও দেখেছি।

পুববাংলায়ও অরন্ধনের রীতি আছে তবে তা এত ব্যাপক নয়। পূর্ববাংলায় কামার, কুমোর, স্বর্ণকার, মণিকার এইসব পেশার মানুষজন নিজেদের যন্ত্রকে বিশ্রাম দেন এদিন। তাকে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে সাধ্যমত পুজো অর্চনা করেন। কেউ কেউ ঠাণ্ডা খাবার খান, কেউ কেউ মদ-মাংস ইত্যাদি খাবার খান। মীরা মুখোপাধ্যায়ের বিখ্যাত বই বিশ্বকর্মার সন্ধানে-তে এ বিষয়ে আশ্চর্যরকম সব তথ্য পাওয়া যায়।

বিশ্বকর্মার বিখ্যাত ক্যালেণ্ডার আর্ট।

বিশ্বকর্মার উল্লেখ শুধু ভারতীয় সংস্কৃতিতেই নয়, পারস্য, চিন, মায়া, ইনকা, ব্যাবিলনের সভ্যতা এসব সংস্কৃতিতেও একইরকম ভূমিকা সম্পন্ন এক দেবতার উল্লেখ পাওয়া যায়। আর ভারতে হিন্দু ধর্মের সঙ্গে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের মধ্যেও বিশ্বকর্মার অনেক উল্লেখ রয়েছে। এমনকী ইলোরার একটি গুহাই বিশ্বকর্মা গুহা নামে প্রসিদ্ধ।

তবে সবচেয়ে উল্লেখজনক তথ্য হল মুসলমান কর্মী-শিল্পীদের বিশ্বকর্মার আরাধনা। সমাজের একেবারে নিচের স্তরের খেটে খাওয়া মানুষদের মধ্যে ধর্মীয় বিধিনিষেধ চিরকালই কম এবং ধর্মীয় সম্পৃক্ততাও সেই স্তরেই সর্বাধিক। কাটোয়া-আজিমগঞ্জের গাজিপুর গ্রামের কামাররা চল্লিশবছর ধরে কলকাতায় লোহার কাজ করছেন। ধর্মে মুসলমান হলেও এইদিন তাঁরা যন্ত্রকে বিশ্রাম দিয়ে তেল সিঁদুর মাখিয়ে ফুল দিয়ে সাজান।

এইদিন কারখানা বন্ধ থাকে এবং হাপরের আগুনও জ্বালানো হয় না। নোয়াখালির কর্মকারেরা গুয়াহাটি ও কলকাতায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন। হিন্দু-মুসলিম দুই ধর্মের এই মানুষেরা কিন্তু রীতিমত নিরামিষ খেয়ে এইদিন যন্ত্রের পুজে করেন। নোয়াখালির বৃদ্ধরা এইদিন দেশে বাইচ খেলার স্মৃতি উসকে দেন। আমি নিজেই ২০১৭ সালে বাংলাদেশ গিয়ে এইদিনে ধলেশ্বরি নদীতে বাইচ খেলা দেখেছি। ঘুড়ি ওড়ানোর বদলে এই দিন ও এর আশেপাশের দিনগুলিতে পুববাংলায় বাইচ খেলার প্রচলন আছে।

অদ্ভুত! কোথায় পুববাংলা আর কোথায় কেরল। কেরলেও এইদিনে ওনাম উৎসবে বাইচ খেলা হয়। নোয়াখালির ডেকা কর্মকাররা রীতিমতো মাংসভাত খেয়ে বিশ্বকর্মা পুজো করে থাকেন। ময়মনসিং-এর নারায়ণচন্দ্র সূত্রধর, নিজে ছুতোর হলেও এইদিনে পৈতে গলায় নিয়ে বিশ্বকর্মাপুজো করেন। কালো হাতির পিঠে, মাথায় পাগড়ি পরা দেবমূর্তি তাঁর আরাধ্য। পুজোর দিন নিরামিষ খেলেও, পুববাংলার মানুষ পরেরদিনেই বিসর্জন দিয়েই মাংসভাতের আয়োজন করেন।

উত্তরভারতের হাঁসে চড়া, হাতিতে চড়া বৃদ্ধ বিশ্বকর্মা, পাঁচপুত্র সহ।

আবার চাঁদপুরের শেখ সুলেমানের কথায় তাঁদের বিশ্বকর্মাপুজোর রীতি জানা গেছে। তাঁরা একে ফাতিয়া বলেন, এবং পুজোর দিনে কোরান পাঠ করে কাঁচা সিন্নি প্রসাদ দেওয়া হয় এবং সেইদিন তাঁরা সকলেই নিরামিষ ভোজন করেন। চাঁদপুরে আরেক শ্রেণির মুসলমান মানুষেরা গাছের গুঁড়িকে দেবতা জ্ঞানে পুজো করে সিন্নি প্রসাদ পান। সঙ্গে চালের গুঁড়ো আর দুধ দিয়ে ফিরনির মতন পায়েস প্রসাদ হয়।

বিশ্বকর্মার পুত্র নলের কথা আমরা জানি। নল ও নীল দুইভাই রামের সেতু বেঁধেছিলেন।পুববাংলায় নল পদবীতে বেশ কিছু কর্মকার পরিবার ছিলেন। আমি নিজে কুমিল্লা জেলার বুড়িচং উপজেলায় ষোলনল নামে এক ইউনিয়ন পরিষদ (ভারতের গ্রাম পঞ্চায়েতের সমতুল্য) ঘুরে এসেছি, যেখানে কৃষিজীবী সম্প্রদায়ের সঙ্গে তাঁতি ও কামারদের বসবাস। তাঁতের টানা ও পোড়েনেই তো কাপড় বোনা হয়।

হিন্দু পুরাণে যেমন চারটে পাহাড়ের বর্ণনা আছে, যারা পৃথিবীকে ধরে রেখেছে, মনে করা হয় বিষ্ণুর কূর্ম(কচ্ছপ) অবতারের চারটি পা এই চারটে পাহাড়। একইভাবে বর্ধমানের পীর মহম্মদ আলি কামার জানাচ্ছেন হারা, লেবানন, আবু কায়েস ও সাফা পর্বত দিয়ে দুনিয়া দাঁড় করানো। এর মধ্যে হিজরাইল বা আজরাইল এসে বদমায়েশি করলে মহাকাইল বা মহাকাল তাকে শায়েস্তা করেন।
ঘুটিয়ারি শরিফের আবদুল সাহেব মানিকপীরের গান করেন। তিনি আবার জানিয়েছেন, আজমের শরিফের নাকি ঘুড়ি ওড়াতে থাকা বিশ্বকর্মার সঙ্গে রক্তন গাজি আর কামাল গাজির দেখা হয়। গাজিরা বলেন, সামনেই জহুরারা মেলা, তুমি আমাদের সঙ্গে চলো, আমাদের ঘুড়ি ওড়ানো শেখাবে।

বাংলাদেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বকর্মা।

তখন বিশ্বকর্মা ঘুড়ির সুতোতে পেঁচিয়ে মাটিতে পড়ে গেলে গাজিসাহেব তাকে তুলে ধরেন। এতে খুশি হয়ে বিশ্বকর্মা গাজিসাহেবের মুরিদ হয়ে যান। তখন রক্তন গাজি আদেশ করেন বিশ্বকর্মাকে, তুমি মক্কায় চলে যাও।

মক্কায় গিয়ে পিরানপীর আর সত্যপীরের সঙ্গে দেখা। সেখান থেকে তাঁরা বাংলায় চলে এলেন। আবদুল সাহেব আবার আরেক গল্পে মক্কায় শিব, বিশ্বকর্মা, বুদ্ধ, নবী মুসা, নবী মুহাম্মদকেও এনে ফেলেছেন। নবী মুহাম্মদ আর নবী মুসা মাটির পুতুল বানিয়ে মা-হাওয়া (বাইবেলের আদিমানবী ইভ) কে ডাকলেন। তিনি এসে হাওয়া ভরে দিলে মানুষের জন্ম হল। পয়গম্বর মুসা শিবকে মক্কায় কাবাপাথরে থাকতে বলেন। শিব তাই কাবার ভিতরে রয়ে যান। বিশ্বকর্মা তাই গঙ্গাকে জমজম কুয়োর সঙ্গে মিলিয়ে দেন।
নোয়াখালির মহম্মদ আলির মতে পয়গম্বর ন্যুহ (বাইবেলের নোয়াহ) ও স্বায়ম্ভব মনু একই মানুষ ছিলেন। ন্যুহ-এর কপালে ত্রিশূলের মত চিহ্ন আঁকা ছিল। তাঁরই নাম ছিল মহাকাইল, সেখান থেকেই মহাদেবের উৎপত্তি।

সুন্দরবনের কর্মকাররা আবার গাজি, ওলাবিবি আর বিশ্বকর্মাকে এক গল্পে এনে ফেলেছেন। গাজি যুদ্ধে জিতে যায়। ওলাবিবি হেরে যায়। ময়দানবের আবাসস্থল হিসেবে ষোল যোজন বলে বনের কথা আসে পুববাংলায়। কে জানে ষোলনলের সঙ্গে তার কোনও যোগ আছে কিনা!!

২০১৭ সালের ২৪ সেপ্টেম্বরে ধলেশ্বরী নদীতে বাইচ খেলা

আজ এইসব গল্প শুনলে হাসি পেতে পারে মৌলবাদী পিউরিটানপন্থীদের। কিন্তু যুগ যুগ ধরে এইভাবেই ধর্ম মিশে গেছে লোকাচারে, লোকাচার মিশে গেছে বিশ্বাসে, যাপনে। ব্রাহ্মণ্যধর্ম থেকে বেশ দূরে মাটির অনেক কাছাকাছি তাই এই বিশ্বকর্মাপুজো। পাড়ার মোড়ে মোড়ে রিকশাস্ট্যান্ডে এইদিনেই শুনতাম নতুন নতুন সাবঅল্টার্ন গান।

ঠিক ছয়মাস পরে যখন আরেক সংক্রান্তির সময় চড়ক, যেখানে মাটির কাছাকাছি মানুষদের উৎসব চৈত্রমাসে, যে মাসে শুভ কাজ হয়না ব্রাহ্মণদের, কায়স্থদের, একইভাবে ভাদ্রে শুভকাজ না হলেও বিশ্বকর্মাপুজো সেরে ঘুড়ি উড়িয়ে পেটভরে মাংসভাত খেয়ে আনন্দ করতে কোনও বাধা থাকে না। এই সংক্রান্তির উৎসবগুলিই অন্যতম আদি উৎসব। এর সঙ্গে কৃষি শিল্প দুই-ই যুক্ত। চৈত্রে কৃষি, ভাদ্রে শিল্প। অন্যান্য সভ্যতাতেও এইদিনে একইরকম বা কাছাকাছি উৎসব।

(কৃতজ্ঞতা: অমিতাভ পুরকায়স্থ, জনজীবনসংস্কৃতি বিশেষজ্ঞ)

Related Articles

Back to top button
Close