fbpx
অন্যান্যঅফবিটআন্তর্জাতিকলাইফস্টাইলশিক্ষা-কর্মজীবনহেডলাইন

আজ বিশ্ব বই দিবস, আশা-আশঙ্কায় বাঙালির বইপ্রীতি

শান্তনু অধিকারী, সবং: বাঙালি বই কেনে। পড়ে কি? নিন্দুকেরা বলেন, ক্রেতা হিসেবে বাঙালি আজও অমলিন। কিন্তু ফিকে হয়েছে তার পাঠকসত্তা। যার প্রমাণ মেলে বাঙালির মেধা, মনন ও মূল্যবোধের অবনমনে। রাজনীতির স্বার্থমাপা আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদে। কারণ, একটিই। বাঙালি আর তাদের ভাবনার খোরাক খোঁজে না শব্দের আধারে। বইয়ের আলমারিতে বই সাজিয়ে তাঁরা মন দেন ফেসবুকে, হোয়াটস অ্যাপে, টিকটকে। ডুব দেন ইদানীংকালের রাজনীতির পঙ্কিলতায়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ‘বই হচ্ছে অতীত ও বর্তমানের মধ্যে বেঁধে দেওয়া সাঁকো।’ সাঁকো ভেঙে বাঙালি কি সত্যিই বই-বিচ্ছিন্ন? আজ ২৩ এপ্রিল বিশ্ব বই দিবসে উঠছে প্রশ্ন।

ইউনেস্কো প্রথম বিশ্ব বই দিবস হিসেবে এই দিনটিকে উদযাপন করে ১৯৯৫-এ। উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের  জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীকে স্মরণীয় করে রাখতে। এবং অবশ্যই বিশ্বের মানুষকে আরও বইমুখী করে তুলতে। এই  বই দিবসের ইতিহাসটি কিন্তু প্রায় শতবর্ষ প্রাচীন। ২৩ এপ্রিল দিনটি স্পেনে ‘গোলাপ দিবস’ হিসেবে উদযাপন করা হত। এইদিন তাঁরা তাঁদের প্রিয়জনদের সঙ্গে গোলাপ বিনিময় করে দিতেন ভালোবাসার বার্তা। ঠিক যেন ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’। কিন্তু ১৯২৬-এর এই দিনটিতেই তাঁরা তাঁদের প্রিয় লেখক, ‘দন কিহতে’র স্রষ্টা মিগুয়েল দ্য সারভেন্তিসকে হারান। স্পেনবাসীরা তাঁর প্রতি সম্মান জানিয়ে এই দিনটিতে গোলাপের পরিবর্তে শুরু করেন বই বিনিময়। যে রীতি আজও বহমান। বলা হয়, ইউনেস্কোর এই বই দিবসের ভাবনাটি স্পেনের এই বই বিনিময়ের রীতি থেকেই নেওয়া।

কিন্তু বাঙালির বই পড়ার চিরকালীন রীতিটি কি আজও আছে? বাংলা পাঠকমহলে অত্যন্ত পরিচিত এক নাম সৌমেন নাথ। বিপর্যয় ব্যবস্থাপণ দফতরের কর্মী হলেও কলকাতার বরানগরের বাসিন্দা এই মানুষটি কিন্তু বই অন্তঃপ্রাণ। তাঁর কাছে জীবনের প্রতিটি দিনই বই দিবস। সেই সৌমেনবাবু কিন্তু এতটুকুও হতাশ নন। বললেন, ‘বাঙালি না বই পড়লে এত এত বই লেখা হচ্ছে কেন? প্রকাশিত হতে না হতেই কোনও কোনও বই কেন আজও ফুরিয়ে যাচ্ছে?’ বাংলার জনপ্রিয় লেখক ও কবি দীপ মুখোপাধ্যায়ও সহমত পোষণ করে বললেন, ‘বাঙালি বই পড়ছে। বাঙালিকে বই পড়তেই হয়। তবে অনেকেই পিডিএফ কিংবা ই-বুক পড়ছেন। সেটা অনেকটাই হাত না লাগিয়ে কাঁটা চামচ দিয়ে ভাত খাওয়ার সমান।’

কিন্তু ভাবীকালের ভার যাদের হাতে? সেই ছোটরা কি বই পড়ছে? দু’জনেই কিন্তু এক্ষেত্রেও সহমত হয়ে জানালেন, ‘ছোটরা বই বিমুখ হয়েছে অনেকটাই।’ এর কারণ হিসেবে দু’জনেই উপযুক্ত শিশুসাহিত্যের খামতিকে দুষলেন। দীপবাবু তো পাল্টা প্রশ্নই ছুঁড়ে দিলেন, এখনকার ছোটরা ‘চাঁদ উঠেছে ফুল ফুটেছে’ কেন পড়বে?  দিন বদলেছে। ছোটরা আর আগের মতো ‘ছোট’ থাকে না। ফলে  ব্যঙ্গমা-ব্যঙ্গমী, রূপকথার গল্প দিয়ে তাদের আর ভোলানো যায় না। তাই শিশুসাহিত্যের বিষয় বদলও জরুরি বলেই মানলেন দীপ মুখোপাধ্যায়।

এ প্রসঙ্গে সৌমেনবাবুর বক্তব্যে উঠে এল আরও একটি প্রসঙ্গ। আগেকার দিনে মা-কাকিমারাও বই পড়তেন। গজেন্দ্রনাথ মিত্র কিংবা বিমল মিত্রদের বইয়ের তাঁরা রীতিমতো নিয়মিত পাঠক ছিলেন। তাঁদের বালিশের তলায় নিদেনপক্ষে একটি সিনেমার পত্রিকা থাকত। যেগুলো ছোটরাও পড়ে ফেলত লুকিয়ে চুরিয়ে। অজান্তেই তৈরি হয়ে যেত বইয়ের প্রতি ভালোবাসা। কিন্তু মা-কাকিমারাও আজ আর বই পড়েন না। বোকাবাক্সেই বন্দি হয়েছে তাঁদের জীবন। একইসঙ্গে বন্দি হয়েছে ছোটদের মনের জগতও। মেদিনীপুরের বাসিন্দা শিক্ষক সুদীপ খাঁড়া জানালেন, তাঁর কন্যা সম্প্রীতিও তেমন বই অনুরাগী নয়। বছর ১৪-র সম্প্রীতি স্থানীয় বিদ্যাসাগর বিদ্যাপীঠের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী, মেদিনীপুরের বাসিন্দা, বছর ১৪-র সম্প্রীতিও তেমন একটা বই অনুরাগী নয় বলেই জানালেন তার বাবা, পেশায় শিক্ষক সুদীপ খাঁড়া।

সবংয়ের চাঁদকুড়ির বাসিন্দা শিক্ষিকা সুলেখা অধিকারী বললেন, তাঁর বছর ১৩-র মেয়ে তিস্তাও মোবাইল ছেড়ে খুব একটা বইমুখো হয় না। তবে যেটুকু পড়ে, সেটুকু ওই রহস্য রোমাঞ্চের গল্পই। আসলে এ চিত্র কেবল সম্প্রীতি আর তিস্তার ক্ষেত্রেই নয়। সব ছোটরাই একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছে বইয়ের থেকে।

তাহলে কি একদিন বাঙালি সত্যিই হয়ে উঠবে বইবিমুখ? এখানেই একটি বিশেষ প্রবণতার কথা শোনালেন সৌমেন নাথ। বললেন, ‘শৈশব কৈশোর উত্তীর্ণরা কিন্তু আবার বইমুখী হচ্ছে। জোরদার হচ্ছে গদ্যসাহিত্য, গবেষণামূলক লোকসাহিত্যের চর্চা। ‘ দীপ মুখোপাধ্যায় তো বলেই ফেললেন, ‘এই লকডাউন কিন্তু বাঙালিকে আবার বইমুখী করে তুলেছে। পুরনো বইয়ের ধুলো ঝেড়ে সবাই আবার বই পড়ছেন।’

ফলে, লকডাউনের জেরে অজান্তেই বাঙালি উদযাপন করছে বিশ্ব বই দিবস। তবে লকডাউন-উত্তরকালে, বাঙালি আবার রবিঠাকুরের ‘গীতাঞ্জলি’ ফেলে রাজনীতির কথাঞ্জলিতে গা ভাসান কিনা, সেটাই দেখার!

ড. মহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছিলেন, ‘জীবনে তিনটি জিনিসের খুব প্রয়োজন। বই, বই এবং বই।’ আব্দুল কালাম বলেছিলেন, ‘একটি বই একশো বন্ধুর সমান।’ আর মার্ক টোয়েন বলেছিলেন, ‘বই পড়ার অভ্যাস নেই আর পড়তে জানে না, এমন লোকের মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই।’ কোন কূলে বাঙালি আগামীর তরি ভিড়াবে, তা এই বিশ্ব বই দিবসই বাঙালির বেছে নেওয়ার দিন!

Related Articles

Back to top button
Close