fbpx
পশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

জামাইয়ের জারিজুরিতে জমজমাট বাংলা প্রবাদ

ভাস্করব্রত পতি, তমলুক : আমাদের দৈনন্দিন সমাজে করার মাঝে প্রবাদ প্রবচন ভুরিভুরি ব্যবহৃত করি। লোকসমাজ তো গড়েই উঠেছে প্রবাদের রমরমাতে। প্রতি মুহূর্তে আমরা ব্যবহার করি অসংখ্য প্রবাদ। এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের ঐতিহ্য। আমাদের জনজীবনের ধারা তথা সংস্কৃতি। এই প্রবাদ যেন বাঙালির নিত্যদিনের জীবনচর্চার জলছবি। তেমনি সেই প্রবাদের দুনিয়াতে বারবার এসেছে ‘জামাই’ এর প্রসঙ্গও।

‘জামাই’ মানেই লোভী একশ্রেণীর চরিত্র। যেন শ্বশুর শাশুড়ির রক্ত চুষে খাওয়া ভ্যাম্পায়ার! বাংলা প্রবাদে ভুরিভুরি তার নিদর্শন। ‘জামাই হারামখোর, আর বেড়াল হারামখোর’। ভাবা যায়! ‘জামাইয়ের জন্য মারে হাঁস, গুষ্টিশুদ্ধ খায় মাস’ ( সংস্কৃতে আছে ‘ জামাত্রর্থং স্রপিতস্য সূপাদেরতিথ্যুপকারকত্বম’)। আসলে জামাইয়ের নাম করে নিজেদের উদরপূর্তির মহানন্দ। জামাইকে তুলনা করা হয় ‘জামাতা দশম গ্রহ’। সংস্কৃতে আছে ‘সদা বক্রঃ সদা ক্রূরঃ সদা মানধনাপহঃ। কন্যারাশিস্থিতো নিত্যং জামাতা দশমো গ্রহঃ। স্বাভাবিকভাবে জামাইয়ের সম্পর্কে মানুষের ধারনা প্রতিভাত এখানে। আর বেয়াদপ জামাইকে কিভাবে ঢিঁট করা যায় তার নিদান এরকম – ‘কিল কনুই মুষ্টি, তবে জামাইয়ের তুষ্টি’। অনেক সময় আমরা পরিচয় দিই ‘অমুকের জামাই’ বলে। এটা সম্মানজনক নয় জামাইবাবাজীর পক্ষে। লোকজনের মুখে ফেরে ‘রাজার যুবরাজ, মোহন্তের চেলা / ফলনীর জামাই, এ নহে ভালা’।

জামাই কখনও আপনার জন হতে পারে না। নিজের রক্তের মেয়েকে জামাইয়ের হাতে তুলে দিলেও সেই জামাই কখনও নিজের হয়না। তাইতো বলতে শোনা যায় ‘জন জামাই ভাগনা, তিন নয় আপনা’। ‘জন’ অর্থে লোকজন বা মজুর বা পরিচারক বোঝায়। কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী লিখেছেন ‘জামাতা ভাগিনা জন আপনার নয়’। তেমনি আমরা বলে থাকি ‘মামা ভাগনে জামাই শালা, আর পোষ্য পুত / ঘরে ঘরে বিরাজ করে, এই পাঁচটি ভূত’। ঠিক এরকমই একটি কথা ‘ঝি দিলেও জামাই নয়, মা দিলেও বাপ নয়’। অর্থাৎ সব জামাই কিন্তু প্রকৃত জামাই হয়ে উঠতে পারে না। তেমনি সব বাবাও প্রকৃত বাবা হয়ে উঠতে পারেন না। আবার অনেক ছেলের কাছে নিজের গর্ভধারিনী মা আপন হয়না। বৌয়ের মা তথা শাশুড়িই হয়ে ওঠে আপনার জন। তাই বলা হয়ে থাকে ‘দুঃখের কথা কারে জানাই / মায়ের পুত নয় , শাশুড়ির জামাই’।

মেয়ে জামাইয়ের সম্পর্ক নিয়ে অনেক প্রবাদ রয়েছে। ‘চতুরালি করে কয় জামায়ের ভূতে / চল সোয়ামী ঘরে যাই কাঁথার ভিতর শুতে’ অর্থাৎ জামাই – ভূত ইঙ্গিত বুঝেনা, তাই চতুরালি করে বলা হয়েছে এটা।
যে জামাই তাঁর বৌকে ভালো রাখতে চায়, তা বৌয়ের সাজগোজেই মরদের পরিচয় বুঝিয়ে দেয়। তাই বলা হয় ‘জামাই যে মরদ মেয়ের খোঁপাতেই পরিচয়’। যে জামাই কর্মহীন বা বেকার তাঁর পক্ষে সংসার চালানো খুব কষ্টসাধ্য ব্যাপার। ফলে তাঁর স্ত্রীকে সুখে রাখাও কঠিন। প্রবাদে বিষয়টা এরকম – ‘জামাইয়ের গোদে শয্যা জুড়লো, মেয়ে শোবে কোথা’! আর ঝি জামাইয়ের খাতির হবে শ্বশুরবাড়িতে। পাড়াপড়শির শুধু দেখা ও সমালোচনা ছাড়া কিছুই করার নেই – ‘যাঁর ঝি তাঁর জামাই, পাড়াপড়শীর কাটনা কামাই’। কাজ করতে যে পারে তাঁকেই বলে উপার্জনশীল। ঠিক তেমনি যদি মেয়েকে সুখে রাখতে পারে তবেই হয় সত্যিকারের জামাই। এটাই লোকমুখে উচ্চারিত হয় ‘খেয়ে বাঁচলে কামাই, মেয়ে বাঁচলে জামাই’। যদি কখনও জামাই রেগে যায় তবে ক্ষতি হতে পারে নিজের মেয়ের। তাই প্রবাদে আছে ‘জামাইয়ের রোষে, আপনার মোষে’। এখানে ‘মুষ’ এর অর্থ ক্ষতি হওয়া।
জামাই যে হয় তাঁর কাজ কেবল বাড়ির মেয়েকে নিয়ে যাওয়া। এতোদিন ছোট থেকে বড় করে তোলার পরে সেই মেয়েকে তুলে দিতে হয় পরের বাড়ির ছেলের হাতে। এটাই সুন্দরভাবে উপস্থাপিত এখানে- ‘আসবেন জামাই নেবেন ঝি, এর বাড়া আর করবেন কি’। পেটের ছেলে যা করতে পারে তা কখনও জামাই করতে পারেনা। এটাই প্রবাদে এরকম ‘গতর কুশলে থাক, করে খাব কামাই / বিস্তর করলে পেটের পুত, কি করবে জামাই’।

মেয়ে জামাই নিয়ে লোকসমাজে এরকম কথাও চাউর রয়েছে ‘জামাইও ভালোনা, পাঁচ ব্যন্নন ছাড়া খায়না/ ঝিও ভালো না, তিন ব্যন্নন ছাড়া রাঁধেনা’। আসলে মেয়ে জামাইয়ের মধ্যেকার ঝগড়া থাকা বা মিলিতভাব না থাকার ঘটনাই প্রতিভাত। আর কিছু জামাই তো খুব উচ্চাকাঙ্ক্ষী। কোনো জিনিসেই মন ভরেনা তাঁর। তাই বলা হয় ‘পাঁচ ব্যন্নন দুধ রুটি / তবু জামাইয়ের ভিরকুটি’।

জামাইয়ের পাতে বড় কই মাছ দিয়ে লোভী শাশুড়ির উক্তি এরকম – ‘পাড়ার লোকও কয়, আমার মনেও লয় / জামাইয়ের পাতের কই মাছ খেলে শাশুড়ির পোলা হয়’। জামাইয়ের ছেলে তথা নাতির ভাতখাবানি ( অন্নপ্রাশন ) নিয়েও চালু আছে – ‘ঢেঁকিতে বারা, পুকুরে পানি, জামাইয়ের বেটার ভাত ছোঁয়ানি’। এখানে বারা অর্থে চাল কোটা। একটু তীর্যকভাবে জামাইয়ের সমালোচনা করা হয়েছে। আর বদমাস জামাইকে সাইজ করতে ‘কিলদগড়ী ওঠ ওঠ / জামাই এলো, কিলে কোট’। ‘কিলদগড়ী’ হোলো যাঁর কিল খেয়ে গায়ে দড়ার মতো দাগ পড়ে গেছে।

শ্বশুরবাড়িতে জামাইয়ের আদর’ কেমন? অনেকটা ঠিক এরকম – ‘জামাই এলো বাড়িতে, ভাত নেইকো হাঁড়িতে’। জামাই যেন শ্বশুর বাড়িতে আসে পেটপুরে খাওয়ার লোভে। প্রবাদে মেলে – ‘খাওয়া দাওয়ার গন্ধে / জামাই আসে আনন্দে’। জামাইয়ের খাওয়াতেও হিসেব কষতে থাকে যাঁরা, তাঁদের কাছে ‘জামাই এলে খায় ভালা, বোঝা যায় হিসাবের বেলা’।
আবার দাশরথি রায়ের পাঁচালী তে আছে – ‘জামাই গেলে শ্বশুরবাড়ি, তিনদিন আদর বাড়াবাড়ি’। জামাই বাড়িতে এলে শ্বশুর শাশুড়ির যে আনন্দ, তা নিয়ে শোনা যায় ‘জামাই এলো কামাই ক’রে, বসতে দাও গো পিঁড়ে / জলপান করতে দাও গো সরু ধানের চিঁড়ে’। তেমনি জামাইয়ের সম্মান যে আলাদা, তা প্রকাশিত এই প্রবাদে – ‘জামাই আসে কামাইয়া, ছাতি ধর নামাইয়া’। কথায় বলে ‘জামাই আদর করা’। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘ষোড়শী’তে লিখেছেন ‘তোমার অনুচরগুলো সন্ধান পেলে জামাই আদর করবে না’। শ্বশুরবাড়িতে জামাইয়ের আদর যে কতখানি উপাদেয়, তা যেন পৃথিবীর সেরা আদর। প্রবাদেই তার প্রমান। তেমনি শ্বশুর শাশুড়ির কাছে জামাইয়ের খাতির এরকম ‘রুইয়ের মুড়ো, কেটো মুড়ো, দাও আমার পাতে / আড়ের মুড়ো, ঘিয়ের মুড়ো, দাও জামাইয়ের পাতে’। যদি মেয়ে সুখে শান্তিতে থাকে, তবে শ্বশুরবাড়িতেও আদর যত্ন ঘটে জামাইয়ের – ‘মেয়ে বাঁচলে জামাইয়ের আদর’।

যাচা জিনিস কখনও ছাড়া উচিত নয়। কথায় বলে যাচা অন্ন ফেলে দিলে পরবর্তীতে নিরন্ন থাকার সম্ভাবনা থাকে। এই বিষয়টিই জামাইয়ের অনুষঙ্গে এভাবে এসেছে বহুবার – ‘যাচলে জামাই খায়না পোনা মাছের মুড়া / শেষে জামাই পায়না ঢেঁকিশালের কুঁড়া’, ‘সাধলে জামাই খায়না, শেষে এঁটো পাতটাও পায়না’, ‘সাধলে জামাই ভাত খায়না, শেষে জামাই আমানিটাও পায়না’, ‘সাধলে জামাই খাননা পিঠে, শেষে মরেন ঢেঁকশাল চেঁটে’, ‘আগে জামাই কাঁঠাল খান না / শেষে জামাই ভোঁতাও পাননা’, ‘সাধলে জামাই খাননা, না সাধলে পাননা’ ইত্যাদি।

অনেক সময় যাঁর উদ্দেশ্যে করা হয় তাঁকে পাওয়া যায়না। অন্য অবাঞ্ছিত লোক দাঁও মেরে চলে যায়। তাই বলা হয় ‘জামাইয়ের লাগি পিঠা বানাই / এসে খায় জামাইয়ের ভাই’। এই জামাইয়ের ভাই কিন্তু সামাজিক ভাবে একটু অন্য রকম। কোনো রকম বিপদে কিন্তু সে ত্রাতা হয়ে ওঠে। তাই বলা হয় ‘জামাইয়ের ভাই গোঁজের আলা’। এখানে ‘গোঁজ’ অর্থে খুঁটি এবং ‘আলা’ আর্থে সেরা। মানুষের দেখনদারি স্বভাব চরিত্র অদ্ভুতভাবে প্রকাশিত এখানে ‘জামাইয়ের বড় কোঁচার ফের / দু’বুড়ি কড়ি সূতোর ফের’।

জামাইয়ের মধ্যে নিকৃষ্ট নাকি ঘরজামাই। অর্থাৎ যে জামাই শ্বশুরবাড়িতে থাকে। ‘ঘরজামাইয়ের নাম নাই / লোকে বলে ফলনীর জামাই’। ঘরজামাই মানেই নাকি শ্বশুরের সম্পত্তির খাদক। ফলে বেশিরভাগ ঘরজামাই পান পাড়া প্রতিবেশীর খোঁটা। ঘরজামাই মানেই শ্বশুরের চাকর- ‘ঘরজামাই আধা চাকর সর্বলোকে চলে / বাপদাদার নাম নাই, ফলনীর জামাই বলে’। আবার ‘ঘরজামাই আনলাম কামাই খাবার আশে / থক দে রে, ঘরজামাই গেঁটের কড়ি নাশে’।

দীনবন্ধু মিত্রের ‘জামাইবারিক’ এ আছে ‘ঘরজামায়ের পোড়ার মুখ’। সত্যিই ঘরজামাইদের শুনতে হয় আরও নানা গালাগাল। এই ‘জামাইবারিক’ য়েই রয়েছে – ‘ঘরজামায়ে পোড়ার মুখ, মরা বাঁচা সমান সুখ’ এবং ‘ঘরজামায়ে ভাতার যার, কানের সোনা নিন্দে তার’। যে পরিবারে ঘরজামাই রয়েছে, তাঁর দুর্দশা কহতব্য নয়। আসলে তাঁর যত্নই মেলেনা। যেন অন্য গ্রহের প্রাণী। শ্বশুরবাড়িতে গলগ্রহ। তাই শোনা যায় ‘দূর জামাইয়ের কাঁধে ছাতি / ঘর জামাইয়ের মুখে লাথি’।

‘প্রহারেণ ধনঞ্জয়’ প্রবাদটিও জামাই অনুষঙ্গতেই। চার জামাই হরি, মাধব, পুণ্ডরীকাক্ষ এবং ধনঞ্জয় শ্বশুরবাড়িতে জামাইষষ্ঠীতে এসে গ্যাঁট মেরে বসেছিল। বাড়ি যাওয়ার নামই ধরেনা। এরপর শ্বশুর ভাতে ঘি দিলোনা। হরি রেগে পালিয়ে গেল।

পরের দিন বসতে পিঁড়ি দিলোনা। মাধব রেগে পালিয়ে গেল। এরপর বাজে রান্না করা হোল। পুণ্ডরীকাক্ষ পালিয়ে গেল। কিন্তু ছোট জামাই ধনঞ্জয় আর শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে যেতে চায়না। তখন বেশ করে উত্তম মধ্যম দিয়ে তাড়ানো হোলো। তখন থেকেই প্রবাদে এলো ‘প্রহারেণ ধনঞ্জয়’!

Related Articles

Back to top button
Close