fbpx
পশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

আজ বিশ্ব ধরিত্রী দিবস কোরোনাই পরোক্ষে দিনটির লক্ষ্যপূরণ করেছে

ভাস্করব্রত পতি, তমলুক : ‘ উই হ্যাভ মেট দ্যা এনিমি, অ্যাণ্ড হি ইজ আস’। অর্থাৎ “আমরা শত্রুর সাক্ষাৎ পেয়েছি, এবং সে হচ্ছে আমরা” । এ উক্তি ওয়াল্ট কেলির। জনপ্রিয় কার্টুন চরিত্র ‘পোগো’কে সামনে রেখে নানা পোস্টারিং করে দূষণ বিরোধী প্রচারে এই কথা যখন বলেছিলেন, তখন শুরু হয়েছিল “ধরিত্রী দিবস” পালন। ফিরে চলুন ১৯৭০ সালে। সেদিনটা ছিলো আজকের মতোই ২২ শে এপ্রিল। আজ থেকে ঠিক ৫০ বছর আগে। তখনই এক পরিবেশপ্রেমী মানুষ বুঝতে পেরেছিলেন আমাদের এই মা তথা পৃথিবীর জন্মদিবস পালন করলে কেমন হয়! মাকে বাঁচাতে পৃথিবীর মানুষের উচিত মায়ের জন্মদিন পালন করা। তিনি মার্কিন সেনেটর গেলর্ড নেলসন।

আসলে ১৯৬৯ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা বারবারাতে তেল ছড়িয়ে পড়েছিল। পরিবেশ দূষিত হয়ে উঠছিল তখন। তারই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭০ এর আজকের দিনে নেলসন যে পরিবেশ আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন তার নাম ছিলো ‘Environmental Teach In’ । সানফ্রান্সিসকোতে সেদিন প্রথম পালিত হয়। এখন ১৯৩ টি দেশে দিনটি পালিত হয়। ডেনিস হায়েস এই দিনটি সম্পর্কে বলেন, এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ধর্মনিরপেক্ষ ছুটির দিন। বিশ্বের ১০০ কোটি মানুষ দিনটা উদযাপন করে। নেলসনকে তাঁর এই মহান কাজের জন্য পরে তাঁকে দেওয়া হয় ‘প্রেসিডেন্সিয়াল মেডাল অব ফ্রিডম’ পুরস্কার।

আজ কোভিড ১৯ এর দাপটে বিশ্বজুড়ে তুলকালাম। ধরিত্রী আজ বিপন্ন। চারিদিকে মৃত্যুর মিছিল। দুনিয়ার শাসনকর্তা আমেরিকাও এখন থরহরি কম্পমান। ‘কি হয় কি হয়’ ভাব সব দেশেই। ১৯৯০ তে এই ধরিত্রী দিবস পালনের ২০ বছর পূর্তি আন্তর্জাতিক ভাবে পালিত হয়। ইউনাইটেড নেশনস ( U.N.) তাদের বার্ষিক পঞ্জীকায় দিনটিকে স্থান দেয়। সেবার অংশগ্রহণ করেছিলো ১৪১ টি জাতি। ২০০৯ তে ইউনাইটেড নেশনস দিনটির নাম পরিবর্তন করে রাখে ‘International Mother Earth Day’।

আরও পড়ুন: ২৭ এপ্রিল প্রত্যেক রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে ফের বৈঠকে বসবেন প্রধানমন্ত্রী

আসলে প্রতি বছর বিশ্বের তাপমাত্রা বাড়ছে। জনসংখ্যা বাড়ছে। দূষিত হচ্ছে ধরিত্রী। এভাবে চলতে থাকলে একজন মায়ের পক্ষে কি তাঁর সন্তানদের বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব সাবলীলভাবে? যেখানে ১৮০০ সালে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ ছিল ২৭০ পি.পি.এম. , সেখানে ২০১৬ সালে তা বেড়ে ৪০৪ পি.পি.এম.। এখানেই প্রমাদ গুনছেন পরিবেশবিদরা। ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ এখন অন্যতম চর্চার বিষয়। যার ৪৯% দায়ি বস্তুটি হোলো কার্বন ডাই অক্সাইড (Co2)। সারা বিশ্বের মোট কার্বন নিঃসরণের ২৮% করে চিন ও ১৬% করে আমেরিকা। কার্বন নিঃসরণ না কমাতে পারলে আমাদের ধরিত্রী গরম হয়ে উঠবে। বিশ্ব ক্রমশঃ বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠবে।

২০১৭ সালের এই দিনটিতেই ঐতিহাসিক প্যারিস জলবায়ু চুক্তি সাক্ষরিত হয়। আমেরিকা, চিন সহ বিশ্বের মোট ১২০ টি দেশ এই চুক্তি স্বাক্ষর করে। বিজ্ঞানীদের হিসেব অনুযায়ী ১৮৮১ থেকে প্রতিবছর গড়ে তাপমাত্রা বেড়েই চলেছে। ১৯৮১ থেকে প্রতি দশকে অ্যান্টার্কটিকা হিমবাহ ১৩.৪% হারে গলছে। সমুদ্রের জলস্তর এর ফলে বাড়ছে নিরন্তর। গত ১০০ বছরে ১৫ সেমি জলস্তরের উচ্চতা বেড়েছে সমুদ্রের। প্রায় ২৭% প্রবাল প্রাচীর নষ্ট হয়ে গিয়েছে সমুদ্রের তলদেশে। IPCC জানিয়ে দিয়েছে আগামী ২১০০ সালে সমুদ্রের জলের উচ্চতা কম করে ১-৪ ফুট বাড়বে। আর তখন বিশ্বের বেশকিছু ভূখণ্ড চলে যাবে জলের তলায়। বিপন্ন হয়ে পড়বে মানবজাতির ভবিষ্যৎ। তাছাড়া যেভাবে ভূগর্ভস্থ জলের অপব্যবহার হচ্ছে তাতে আগামী ২১০০ সালে বিশ্বজুড়ে লড়াই হবে পানীয় জলের। একফোঁটা জলের জন্য মানুষের মধ্যে মানুষের লড়াই হবে রক্তক্ষয়ী।

তাহলে কিভাবে বাঁচাবো আমাদের এই সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা ধরিত্রীকে? এই দিনটির উদযাপন কিভাবে করবো? ওয়াল্ট কেলির কথানুসারে ‘আমরা’ তথা মানুষকেই সচেতন হতে হবে নিজেদের বাঁচাতে। গাছ কেটে বনসম্পদ নষ্ট নয়, প্রচুর পরিমাণে গাছ লাগিয়ে ধরিত্রীকে সবুজ করে তুলতে হবে। এরফলে উদ্ভুত কার্বনের আত্মীকরণ ঘটবে বেশি মাত্রায়। যার ফলে কমবে গ্লোবাল ওয়ার্মিং। শুধু কলকারখানা বন্ধ করে কার্বন কমানোর পরিকল্পনা ছেড়ে আমাদের আয়েসি জীবনের প্রতি লাগাম টানলেও কার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বেশি দূরের যাত্রাতে প্রাইভেট গাড়ির পরিবর্তে গণপরিবহন ব্যবস্থাতে আস্থা রাখতে হবে। অল্প দূরত্ব যেতে হেঁটে বা সাইকেলে চেপে যাওয়া যায়। অচিরাচরিত শক্তির ব্যবহার বাড়ানো দরকার। জীবাষ্ম জ্বালানীর ব্যবহার কমিয়ে ফেলতে হবে যতটা সম্ভব। জ্বালানী সাশ্রয়ী যানবাহন বেশি ব্যবহার করতে হবে। পুনরুৎপাদন সম্ভব তথা পুনব্যবহারযোগ্য এরকম সামগ্রী দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। রক্ষা করতে হবে আমাদের পরিবেশের জীববৈচিত্র্য। তবেই ধরিত্রীকে রক্ষা করা সম্ভব।

আরও পড়ুন: এই চরম দুর্দিনে বাংলার বুদ্ধিজীবী ও জাগ্রত-বিবেকদের ভূমিকা কোথায় !!

২০১৪ তে বিশ্ব ধরিত্রী দিবসের থিম ছিল ‘Cities of Greenery’ । ২০১৫ তে ছিলো ‘Green Earth , Clean Earth with Wonderful World of Water’ । ২০১৬ তে ছিলো ‘Trees for the Managing Earth Resources’। ‘Environmental and Climate Literacy’ ছিলো ২০১৭ সালে। ‘End Plastic Polution’ ২০১৮ তে ছিলো । গতবছর তথা ২০১৯ এ বিশ্ব ধরিত্রী দিবসের থিম ছিলো ‘Protect our Species’ ।

চলতি বছরে আজকের দিনটির থিম হোলো ‘ Climate Actions’ । আজকের দিনটির গুরুত্ব বুঝে গুগল তাদের ডুডলেও দিনটিকে উপস্থাপন করেছে। এক সপ্তাহ জুড়ে চলবে দিনটির উদযাপন। যদিও এখন সারা বিশ্বজুড়ে লক ডাউন থাবা বসিয়েছে আমাদের জনজীবনে। আসলে কিন্তু পরোক্ষভাবে এই দিনটির লক্ষ্য অনুযায়ী উদযাপন প্রক্রিয়াই চলছে। কল কারখানা বন্ধ, যানবাহন বন্ধ, দূষণ কম হচ্ছে। এটাই তো ধরিত্রী দিবসের লক্ষ্য ছিলো। লক ডাউন বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক পরিকাঠামোতে থাবা বসালেও আসলে চুপচাপ কমিয়ে দিয়েছে বিশ্বজুড়ে কার্বন নিঃসরণের হার। নিয়ম, চুক্তি,হুমকি দিয়েও বিশ্বের তাবড় তাবড় দেশগুলোর কার্বন নিঃসরণের হার কমাতে পারা যায়নি তেমনভাবে, বরং বেড়েই গিয়েছিল! এই কোরোনার হাত থেকে বাঁচতে অর্থনীতি ধ্বংস করেও কলকারখানা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে সবাই। চলছেনা বেশিরভাগ যানবাহন। এটা তো একটা বিশাল পাওয়া। আমরা তাই বলতেই পারি ‘কোরোনা’ আসলে ধরিত্রী দিবসের যথার্থ রূপায়ন করে দিয়েছে এ বছর‌।

Related Articles

Back to top button
Close