fbpx
গুরুত্বপূর্ণবিনোদনহেডলাইন

সুরে সুরে বাঁশবাগানে চাঁদ ওঠা থেমেছে আজ ১৬ বছর

প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রয়াণে সর্বাণী মুখোপাধ্যায়ের শ্রদ্ধার্ঘ্য

সর্বাণী মুখোপাধ্যায়: অদ্ভূত মিষ্টি ছিল তাঁর গলা। মানুষটিও ছিলেন সেরকমই। আমাদের প্রতাপাদিত্য রোডের লালবাড়ির জোড়াখাটে বসে কত যে গান গেয়েছেন তার হিসেব নেই। আমরা দুই ভাই-বোন তাঁকে ডাকতাম  ‘প্রতিমাপিসি’ বলে। আপনির বদলে তুমিই বলতাম। বেশিরভাগ সময়ই হেমন্তকাকু মানে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে আসতেন। তাঁর আসার সঙ্গে অনেক সন্ধের স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। সেরকমই এক সন্ধের কথা আজ বলি।

সে দিন প্রতিমাপিসি এসেছেন হেমন্তকাকুর সঙ্গে। মারণরোগে ভোগা আমার ছোট ভাই জয় আবদার ধরল ‘ত্রিবেণী তীর্থপথে কে গাহিল গান’ টি প্রতিমাপিসিকে গাইতে হবে। মহাবিপদ, হিন্দুস্থানি সরগমের পুরো গানটি চিন্ময় লাহিড়ীর সঙ্গে উনি  ‘শাপমোচন’ ছবিতে ডুয়েট গেযেছিলেন। প্রতিমাপিসি খুব ভয়ে ভয়ে হেমন্তকাকুকে বলল ওই অংশটি গাইতে…তো হেমন্তকাকু রেগে গিয়ে তাঁকে দিল এক রাম ধমক…‘ওই গান কি আমি গাইতে পারি?  তুই সেটা জানিস না?’

আরও পড়ুন:করোনা আবহের মধ্যেই ঈদে শিশুদের জন্য প্রকাশিত মোকতার হোসেন মন্ডলের ‘শিমুল ফুলের মাইক’

বাচ্চা মেয়ের মতো আরও ভয়ে ভয়ে প্রতিমাপিসি জিজ্ঞেসা করেছিলেন…‘তাহলে কি করব এখন?’…

হেমন্তকাকু আর জোর গলায় হুকুম করলেন… ‘দুজনেরটাই তুই একা গাইবি। নে এবার ধর শিগগির…’

লক্ষ্মীমেয়ের মতো ঘাড় কাত করে হুকুম তামিল করল প্রতিমাপিসি পরমুহূর্তেই। বিনা বাক্যব্যয়ে হারমোনিয়াম টেনে নিলেন। পরক্ষণেই সেই মধুঝরা কণ্ঠে বেজে উঠল আগাগোড়া ক্ল্যাসিকাল বেসের এবং উত্তম-সুচিত্রা রোম্যান্টিক জুটির সেই বিখ্যাত গান ‘ত্রিবেণী তীর্থপথে কে গাহিল গান…’। অবলীলায় চিন্ময় লাহিড়ীর গাওয়া অংশ এবং নিজের অংশ মিশিয়ে খুব সহজেই প্রতিমাপিসি শোনালেন পুরো গানটি। উপস্থিত সবাই আমরা মন্ত্রমুগ্ধ। ফের ঘোর ভাঙল হেমন্তকাকুর বাঘা ধমকে…‘এটা আমাকে দিয়ে হত? তুই ছাড়া এই ডুয়েট একলা গাওয়ার ক্ষমতা আছে কারুর?’ প্রতিমাপিসি আরও গুটিয়ে গিয়ে অপরাধীর মতো মাথা নীচু করে বসে রইল।

আমার বাবা সাহিত্যিক আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, হেমন্তকণ্ঠকে বলতো ‘সোনা বাঁধানো গলা’, আর প্রতিমাকণ্ঠকে বলত, ‘মধুবাতা ঋতায়ত মধুক্ষরন্তী সিন্ধবঃ…| এখনও চোখে ভাসে আরও একটি সন্ধের কথা। সেদিনও হেমন্তকাকু সঙ্গে ছিল। দু’জনে মিলে পাল্টাপাল্টি করে অনেকগুলো গান শুনিয়েছিল ওই দিন সন্ধ্যায়। ‘নীঙাড়িয়া নীল শাড়ি শ্রীমতি চলে’ গানটি গাওয়া হলে হেমন্তকাকুর টার্নের জন্য প্রতিমাপিসি তাঁর দিকে তাকিয়ে থেমে থেকেছিল।

আরও পড়ুন:রাম বিরোধীরা দেশদ্রোহী! তোপ বিশ্ব হিন্দু পরিষদের

কে উঠল-‘তোর এই গানের পরে আমি আর গাইব না, বাকি গানগুলো তুইই গাইবি’। একরাশ লজ্জা এবং কুণ্ঠা নিযে কিন্নরকণ্ঠী প্রতিমাপিসি তাঁর গান্ধর্বী গলায় শুনিয়েছিল-আরও অনেকগুলো গান। ‘বাঁশ বাগানের মাথার ওপর চাঁদ উঠেছে ওই’, ‘একটা গান লিখো আমার জন্য’, ‘এই কথটি মনে রেখো’, ‘তরীতে পা দিইনি আমি, ‘চরণ ধরিতে দিও গো আমারে’, ‘আমার হাত ধরে তুমি নিযে চলো সখা’, ‘এই লভিনু সঙ্গ তব সুন্দর হে সুন্দর’, ‘আমার জীবন নদীর ওপারে, এসে দাঁড়াযো দাঁড়াযো বঁধূ হে’।

এরপরের লাইন ‘আমি তরীটি বাহিযা আসব,  তুমি চরণখানি বাড়ায়ো বাড়ায়ো বাড়ায়ো হে’ গাওয়ার সময তাঁর গলা কান্নায় বুজে আসছিল।  ‘দিনের আলোটি নিভে যাবে যবে’ লাইনটি গাইতে গাইতে অপরিসীম বেদনায় প্রতিমাপিসির কণ্ঠস্বর নিভু-নিভু। একেবারের শেষে ‘আমি আপনা হারায়ে নিজহারা,  তুমি এতোটুকু হারায়ো হারায়ো হারায়ো, বঁধূ হে’, গাইতে গিযে চোখ থেকে টস টস করে জল পড়ছিলে তাঁরা। সেটাই ছিল সেই সন্ধের শেষ গান। মৃত্যুপথযাত্রী আমার ভাইযের সঙ্গে একাঙ্গ-একাত্ব হয়ে গিয়েছিল প্রতিমাপিসি সেইদিন গান গাইতে গাইতে। এর কদিন পরেই প্রতিমাপিসির এই গানের সঙ্গে বোধহয় সুর মেলাতে জীবন-নদী পার হওয়ার নৌকোতে পা রেখেছিল আমার ভাই।

 

 

Related Articles

Back to top button
Close