fbpx
অন্যান্যপশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

অপ্রচলিত কালো ধানের চাষ

নিজস্ব প্রতিনিধি: পশ্চিমবাংলার প্রধান খাদ্যশস্য ধান। সরু-মোটা, সুগন্ধী চালের চাষ এ রাজ্যে হয়েই থাকে। বর্তমানে নানা রঙের ধান চাষ হচ্ছে। এই মুহূর্তে কালো চালের চাষ জনপ্রিয় হচ্ছে এই রাজ্যে। বেশ কিছু প্রগতিশীল চাষী সরকারি উদ্যোগে এই চাষে লাভের মুখ দেখেছেন। ধানের মধ্যে যেসব বন্যজাত রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম ব্ল্যাকরাইস। কৃষক এবং কৃষি বিশেষজ্ঞের কথায় এটি মূলত ওষধি ফসল। অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরা এই কালো চাল ওবেসিটি কমায়, ক্যান্সার প্রতিরোধ করে। অন্য ধান চাষের মতোই এই ধানও চাষ করতে হয় তবে তা সম্পূর্ণ জৈব পদ্ধতিতে।

 

জৈব পদ্ধতিতে চাষ করতে গেলে খেয়াল রাখতে হবে ওই মাটিতে যে কোনওরকম রাসায়নিক সার না দেওয়া হয়। যদি রাসাযনিক সার দেওয়া জমিতে জৈব পদ্ধিতে চাষ করতে হয় তবে সেই জমিকে অর্গানিক চাষের উপযুক্ত করে নিতে হবে। মূলত গোবরসার, সরষের খোল, বাদামের খোল, বিভিন্ন শুকনো পাতা ইত্যাদিকে ডিকম্পোস্ট করে জৈবসার তৈরি করে নেওয়া হয়। পশ্চিম মেদিনীপুরের প্রগতিশীল চাষি নিতাই দাস ২০১৬ সাল থেকে নিয়মিত ব্ল্যাক রাইসের চাষ করে আসছেন। একটি এনজিও-র মাধ্যমে তিনি এই ধানের বীজ পান এবং প্রায় র একর জমিতে এর চাষ শুরু করেন। তিনি এই চাষে লাভের মুখ দেখেছেন। প্রায় ১০০০ টাকা কিলো চাল তিনি বাজারে বিক্রি করতে পেরেছেন। তবে এই চালের এতো দাম বলেই অনেক চাষিভাই এই চাষ করতে ভরসা পান না। সম্পূর্ণ জৈব পদ্ধতিতে এই চাষ করতে গেলে প্রথমে বিশ্বস্ত জায়গা থেকে এই ধানের বীজ সংগ্রহ করতে হবে। নিতাইবাবু আত্মনির্ভর সরকারি প্রকল্পের আওতায় এই বীজ সংগ্রহ করেছেন। বীজ রোপণের আগে বীজগুলিকে একদিন (২৪ ঘণ্টা) ট্রাইকোডারমা ভিরিডিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে। যদি তা সম্ভব না হয তাহলে কমপক্ষে ৩০ মিনিট ভিজিয়ে রাখা জরুরি। সেক্ষেত্রে নর্মাল জলে বীজগুলিকে ভিজিয়ে রাখবেন।

 

জল থেকে বীজ তুলে রোদে শুকিয়ে শোধন করে মাটিতে রোপণ করতে হবে। বীজ বপনের ১৫-২০ দিন পরে চারা বের হয়। তারপর মূল জমি তৈরি করে ১০/৮ ইঞ্চি দূরত্বে অগভীরভাবে চারা রোপণ করতে হবে। এই ধানে রোগ-পোকা কম, তবু বীজ শোধনের পরেও ট্রাইকোডারমা ভিরিডি নিয়ম করে স্প্রে করলে ধানের গোড়াপঁচা রোগ সহ অন্যান্য রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। নাইট্রোজেনের পরিমাণ বেশি এমন জমিতে এই ধানের চাষ ভালো হয়। নিয়মিত পরিচর্যা এবং সময মতো নিড়ানি দিয়ে জমি পরিস্কার রাখতে হবে। আষাঢ় মাসের শেষ দিকে চাষ শুরু করলে অগ্রহায়ন মাসের শেষ দিকে ফসল কাটার উপযুক্ত হয়। সাধারণ ধানে শীষ আসার পরে এই ধানের শীষ দেখা যায়। অত্যাধিক তাপমাত্রা এই চাষের উপযোগী। এবার এই চাষের কিছু অসুবিধের কথা জেনে নেওয়া যাক। এই চাষে মূল অসুবিধে হল দুটি, বাজারে দাম না পাওয়া এবং বিশেষ ধরনের রাইস মিল। শরীর সুস্থ রাখতে এবং ক্যান্সার, ডায়াবেটিসের মতো রোগ প্রতিরোধকারী কালো চাল উত্পাদন করেও বাজার না পাওয়ায় আগ্রহ হারাচ্ছেন কৃষকদের অনেকেই। কৃষি দপ্তরের পক্ষ থেকে ব্ল্যাক রাইস চাষের জন্য উত্সাহিত করা হলেও চাষিদের অভিযোগ, ব্ল্যাক রাইস ভাঙানোর জন্য যে বিশেষ ধরনের মিল দরকার তা বেশিরভাগ জায়গাতেই নেই।

 

সাধারণ রাইস মিলে ব্ল্যাক রাইস ভাঙানোর ফলে চালের উপরে যে ফাইবার থাকে, তা উঠে যাচ্ছে। ফলে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে কালো চালের গুণ। স্বাভাবিকভাবে চালের দাম পাচ্ছেন না তাঁরা। আর এতেই ব্ল্যাক রাইস চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন বেশিরভাগ কৃষক। ব্ল্যাক রাইস ভাঙানোর জন্য সরকারি তরফে ইতিমধ্যে গড়বেতা, পুরুলিয়া, শিলিগুড়ির খড়িবাড়ি, রানাঘাটের মতো বেশকিছু জায়গায় মেশিন দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া চাষিদের জমিতে উত্পাদিত ব্ল্যাক রাইস রপ্তানি করার জন্য এর প্রচারও করা হচ্ছে। ভিনরাজ্যে ব্ল্যাক রাইস রপ্তানি শুরুও হয়েছে। নিতাই দাস বলেন, প্রথম বছর টাকা কেজি দরে ব্ল্যাক রাইসের বীজধান বিক্রি করেছিলেন তিনি। চালও বিক্রি হয়েছিল ১০০০ টাকা কেজি দরে। ব্ল্যাক রাইস যে উপকারি চাল তা এলাকার কৃষকদের বোঝানোয় অনেকেই এই ধান চাষে এগিয়ে এসেছিলেন। ইন্টারনেট ঘেঁটে তাঁরা দেখেছিলেন, বিদেশেও এই চালের দারুণ চাহিদা রয়েছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোনও রপ্তানিকারক তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি।

 

নিতাইবাবু বলেন, তাঁদের এলাকায় ব্ল্যাক রাইস ভাঙানোর মতো কোনও মিল নেই। ফলত অনেক চাষি এই চাষ থেকে পিছিয়ে যাচ্ছেন। বাজার না পাওয়ায় পড়ে থেকে চাল নষ্টও হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য, এই চালের যে পুষ্টিগুণ তা যদি সবার মাঝে আরও বেশি করে প্রচার করা সম্ভব হয়, তাহলে হযতো রফতানির মাধ্যমেও চাষিরা লাভের মুখ দেখবেন এবং আশা করা যায় বিদেশে একটি বাজার তৈরি হলে চাষিরা চাষে উত্সাহিত হবেন।

 

 

 

 

Related Articles

Back to top button
Close