fbpx
গুরুত্বপূর্ণপশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

একুশের নির্বাচনে দীর্ঘ বঞ্চনার অবসান চাইছে মুর্শিদাবাদের ফারাক্কা

মুসলিম অধ্যুষিত ফারাক্কায় এগিয়ে কংগ্রেস, দ্বিতীয় বিজেপি

মোকতার হোসেন মন্ডল:

২০১৬ সালের ফল

কংগ্রেস- ৮৩৩১৪
তৃণমূল কংগ্রেস ৫৫১৪৭
বিজেপি ১৫৯৫২

২০১৯ লোকসভার ফল

কংগ্রেস ৭৬,১০৭,
তৃণমূল কংগ্রেস ৪৪৫২৮,
বিজেপি ৪৬৮৮৬

একুশের নির্বাচনে দীর্ঘ বঞ্চনার অবসান চাইছে নবাবের রাজধানীর জেলা মুর্শিদাবাদের ফারাক্কার মানুষ। স্বাধীনতার পর এতদিন মূল রাজনৈতিক লড়াই বাম ও কংগ্রেসের মধ্যে হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে তৃণমূল কংগ্রেস একটা বড় শক্তি। আর তাই অতীতের রাগারাগি ভুলে বাম-কংগ্রেস গলাগলি করে বিগত বছরগুলোতে লড়াই করেছে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে। কিন্তু ২০১৯ সালের নির্বাচনে এখানে উঁচু ফণা তুলেছে পদ্ম। বাম-কংগ্রেসের পরেই তার ভোটের শতাংশ। তাই তৃণমূল কংগ্রেস ও বাম-কংগ্রেস একটু রাজনৈতিক ভুল করলেই যেকোনও মুহূর্তে ছোবল মারতে পারে পদ্মকাঁটা ।

কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে একাধিক ক্ষোভ লক্ষ করা যাচ্ছে। ফারাক্কার এক প্রভাবশালী সমাজকর্মী এই প্রতিবেদককে জানান, একদল থেকে আরেক দল আসে, কিন্তু উন্নয়ন হয়না। গঙ্গা ভাঙনের জন্য বহু মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। দীর্ঘ সময় ধরে বছরের পর বছর মানুষ ভাঙনের ফলে অসহায় হচ্ছে। এটা ফারাক্কার সব চেয়ে বড়ো সমস্যা। যথাযথ ভাবে ভাঙ্গন প্রতিরোধ করার ব্যবস্থা গ্রহণ, মাস্টার প্ল্যান তৈরি, বাজেট বরাদ্দ ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের পুনর্বাসন জরুরী।

ওই সমাজকর্মীর আরও অভিযোগ, স্বাস্থ্য পরিষেবা যথোপযুক্ত নয়। এর উন্নয়ন হওয়া জরুরি। চিকিৎসা ক্ষেত্রে খুব সমস্যার মধ্যে ফারাক্কাবাসীকে পড়তে হয় হয়। অর্জুনপুর প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রের মানোন্নয়ন দরকার। ব্যবসায়ী সেখ আবু তাহের, সমাজসেবী জানে আলম মোমিন বলছেন, এখানে বিড়ি শিল্পের উপর অধিকাংশ মানুষ নির্ভরশীল। বাড়ির মহিলা থেকে শিশু সকলেই এর সাথে যুক্ত। স্বাস্থ্যকর পরিবেশের অভাব, সরকার নির্ধারিত মজুরি থেকে বিড়ি শ্রমিকরা বঞ্চিত। বহু চেষ্টার পরে ডাকবাংলার তারাপুরে বিড়ি শ্রমিকদের জন্য সেন্ট্রাল হসপিটাল গড়ে তোলা হলেও এখন তার অবস্থা জরাজীর্ণ। সমস্ত বিভাগ ও পরিকাঠামো নিয়ে গড়ে তোলা হলেও বর্তমানে একেবারে নূন্যতম পরিষেবা ও মানুষ পাচ্ছে না। এখানকার জনপ্রতিনিধি বা কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্য সরকারের কোনো হেলদোল নেই।

একাধিক সমস্যার পাশাপাশি এখানে বেকারত্বের সমস্যা আছে। পেট চালাতে এলাকার মানুষকে ভিন রাজ্যে যেতে হয়। সঠিক কর্মসংস্থান নেই। ফারাক্কা ব্যারেজ ও এনটিপিসি প্রজেক্টের মাধ্যমে কিছু মানুষের কাজের সুযোগ হলেও তা মোটেই যথেষ্ট নয়। তাছাড়া এখানে জনসংখ্যার নিরিখে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অপ্রতুলতা রয়েছে। অন্য দিকে সচেতনতার অভাবে স্কুল ছুট ছাত্র – ছাত্রীর সংখ্যা অনেক আছে।

স্থানীয় মানুষদের আরও অভিযোগ, রাস্তাঘাট বা যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও ঘাটতি আছে। ফারাক্কা বিধানসভা এলাকার বিস্তৃতি অনেক বেশি। সব জায়গার ক্ষেত্রে যোগাযোগের ব্যবস্থা সঠিকভাবে গড়ে ওঠেনি। জল নিকাশি ব্যবস্থার ও অভাব রয়েছে। তাছাড়া পানীয় জলের সমস্যা আছে। নলকূপ বসানো এইখানে খরচ সাপেক্ষ। সেই জন্য আরও সমস্যা, সেই সঙ্গে জলে আর্সেনিকেরও সমস্যা আছে।
জানা গেছে, বাহাদুরপুর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকা আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকা। সংখ্যালঘু মুসলিম এলাকার মতো তারাও নানান পরিষেবা থেকে বঞ্চিত বলে অভিযোগ। নঈম আখতার, মেহবুব আলম,আরিফ খান,রাকিবুলরা বলছেন, ফারাক্কার মহেশপুর এলাকার গঙ্গা ভাঙন তীব্র। প্রতিবছর বাড়িঘর তলিয়ে যায়।

স্থানীয়রা বলছেন, এলাকার লিচু চাষ রাজ্যে বিখ্যাত হলেও- বাগান চাষিরা ফসলের ন্যায্য মূল্য পাননা। এখনও অনেক এলাকায় বিদ্যুতের একাধিক সমস্যা। ফিডার ক্যানেলের উপর নির্মিত দুটি সেতুর অবস্থা ভালো নেই। তবে অনেকে বলছেন, আগের চেয়ে এখন রাস্তাঘাটের অবস্থা যথেষ্ট ভালো।

ফারাক্কা বিধানসভা কেন্দ্রটি ফারাক্কা সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক, গাজিনগর মালঞ্চ এবং কাঞ্চনতলা গ্রাম পঞ্চায়েত গুলি সামশেরগঞ্জ ব্লকের অন্তর্গত। এটি পূর্বে মুর্শিদাবাদ জেলার জঙ্গিপুর লোকসভার মধ্যে থাকলেও এখন দক্ষিণ মালদা লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত। ২০১৬ সালের বিধানসভায় ফারাক্কা কেন্দ্রে কংগ্রেসের মইনুল হক ৮৩৩১৪ ও তৃণমূল কংগ্রেসের মুহাম্মদ মুস্তফা পেয়েছেন ৫৫১৪৭ ভোট। বিজেপির ইন্দ্রানাথ উপাধ্যায় ১৫৯৫২ ও ওয়েলফেয়ার পার্টির ডাঃ রেজাউল করিম ৪০২২ ভোট পেয়েছেন। সেবার শতাংশের বিচারে বামও কংগ্রেস ৫১.০৫, তৃণমূল কংগ্রেস ৩৩.৭৯, বিজেপি ৯.৭৭ এবং ওয়েলফেয়ার পার্টি ২.৪৬ % ভোট পায়।

কিন্তু ২০১৯ লোকসভার সময় ভোটে ব্যাপক মার্জিং বাড়ায় বিজেপি। এখানে বাম- কংগ্রেস পেয়েছে ৭৬,১০৭ ভোট। তৃণমূল কংগ্রেস ৪৪৫২৮ ও বিজেপি পেয়েছে ৪৬৮৮৬ ভোট। রাজনৈতিক মহলের অনেকে বলছেন, বাম-কংগ্রেসের জোট না হলে ফারাক্কায় বিজেপি প্রথম হত। সেক্ষেত্রে আগামী একুশের নির্বাচনে দলটি মেরুকরণের রাজনীতি করে এই কেন্দ্রে বেশি লাভ করতে পারবে না। তাই জিততে হলে উন্নয়ন নিয়ে বেশি কথা বলতে হবে। কিন্তু লোকসভার নিরিখে দ্বিতীয় থাকলেও বিধানসভায় বিজেপি এখানে তেমন ভোট পাবেনা বলে অনেকের মত।

একটি রাজনৈতিক দলের নেতা বলেন, লোকসভায় আগেও বেশি ভোট পেয়েছে। কিন্তু বিধানসভার অঙ্ক অন্য। এখানে ওয়েলফেয়ার পার্টি, বিএসপি সহ বেশ কিছু দল ও সামাজিক সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক অঙ্ক কী হবে বলে কঠিন।

এখানে কংগ্রেস, বাংলা কংগ্রেস ছাড়াও একাধিকবার সিপিআইএম জয়ী হয়েছে। তবে ১৯৮৬ সাল থেকে কংগ্রেসের মইনুল হক জয়ী হয়ে আসছেন।
তবে সাধারণ মানুষ বলছেন, বারবার রাজনৈতিক পরিবর্তন হলেও এলাকার উন্নয়ন হয়নি। এরজন্য বিগত ও বর্তমান রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, বিধায়ক,সাংসদকেই অনেকে দায়ী করছেন। মানুষের প্রশ্ন, ঐতিহাসিক মুর্শিদাবাদ জেলাকে আর কতদিন বঞ্চিত করে রাখা হবে? তাই একুশের নির্বাচনে এমন একটি নীতি নৈতিকতা পূর্ন অসাম্প্রদায়িক দল জয়ী হোক যে সকলের জন্য কাজ করবে।

Related Articles

Back to top button
Close