fbpx
পশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

জল সঙ্কটে শিল্পাঞ্চল, দুর্গাপুর ব্যারেজের লকগেট মেরামতে উন্নত প্রযুক্তি ব্যাবহারের দাবি শহরবাসীর

জয়দেব লাহা, দুর্গাপুর: তিনবছর পর আবারও দুর্গাপুর ব্যারেজের লকগেট বিপর্যয়। মেরামতের জন্য জলশূন্য ব্যারেজ। জলশূন্য করে ৪-৫ ধরে মেরামতে চরম ভোগান্তির শিকার শিল্পাঞ্চলবাসী। জলসঙ্কটের মুখে গোটা আসানসোল-দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চল। প্রশ্ন উঠেছে, প্রযুক্তির যুগে লকগেট মেরামতে প্রযুক্তির ব্যাবহারের পরিকল্পনায়। ব্যারেজের আধুনিকিকরণের দাবি করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। কতদিনে মেরামত হবে, কখন জলপুর্ন হবে ব্যারেজ? এ ব্যাপারে একদম অন্ধকারে শহরবাসী।

প্রসঙ্গত, শনিবার সকালে দুর্গাপুর ব্যারেজের ৩১ নং লকগেটের সাপোর্টিং খিল ছিড়ে পড়ে। জলের চাপে ভেঙে বাঁক ধরে যায়। আর তার ফলে হু হু করে ব্যারেজের জল বেরিয়ে যেতে থাকে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় প্রশাসনিক আধিকারিকরা।
লকগেটে বড়সড় দুর্ঘটনা ঠেকাতে পার্শ্ববর্তী লকগেটও খুলে দেওয়া হয়। বিকাল নাগাদ গোটা ব্যারেজে জলশূন্য হয়ে পড়ে। চলতি বর্ষায় ভাল বৃষ্টিপাতের দরুন দামোদর উপকুলবর্তী ও শাখা নদীর জল নামতে থাকে। তার জেরে একবারে জলশূন্য সম্ভব হয়নি। ফলে মেরামতের কাজ শুরুতে বিলম্বিত হয়। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় সেচ দফতর পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা শুরু করে।

রবিবার সকাল থেকে ৩১ নং লকগেট দিয়ে যাওয়া জলস্রোত ঘোরাতে বালির বস্তা দিয়ে গার্ডওয়াল দেওয়ার কাজ শুরু হয়। কিন্তু কাজের গতি প্রকৃতিতে নানান প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। রবিবার ব্যারেজ পরিদর্শনে আসেন রাজ্যের অতিরিক্ত মুখ্য সচিব নবীন প্রসাদ, সেচ দফতরের সচিব গৌতম চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ। এদিন সেচ দফতরের সচিব গৌতম চট্টোপাধ্যায় বলেন,” উপরিভাগের জলস্রোতের গতি ঘোরানো হচ্ছে। তারপর বিকল লকগেটটি তুলে নতুন লকগেট বসানো হবে এবং ব্যারেজ জলপুর্ন করা হবে।”

প্রসঙ্গত, দামদরের দুর্গাপুর ব্যারেজের ওপর নির্ভরশীল গোটা শিল্পাঞ্চল। দুর্গাপুর তাপবিদ্যুৎ, মেজিয়া তাপবিদ্যুত, ডিপিএল , দুর্গাপুর ইস্পাত, পানাগড়ে ম্যাট্রিক্স সারকারখানা, অন্ডালে তাপবিদ্যুৎ সহ একাধিক শিল্প কারখানা ব্যারেজের ওপর। গোটা শহরের পানীয় জল ব্যাবস্থাও নির্ভরশীল এই দামোদরের ব্যারেজের ওপর। ডিভিসির মাইথন, পাঞ্চেত জলাধার থেকে দামোদর ব্যারেজে রাখা হয়। সেখান থেকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োজন মত সরবরাহ করা হয়। ব্যারেজ জলশূন্য করতে ঝাড়খন্ডে থাকা ওই দুই জলাধারের জল ছাড়া আটকানো হয়। আর তার জেরে দুর্গাপুরে থাকা ফিডার ক্যানেল জলশূন্য। একই সঙ্গে আসানসোল শহরেও জোগান দেওয়া রিজার্ভারে সঙ্কটের আশঙ্কা দেখছে। ফলত গোটা শিল্পাঞ্চল এখন জলসঙ্কটের মুখে।

ডিভিসির মেম্বার সেক্রেটারী পিকে মুখোপাধ্যায় জানান, মেজিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে মজুত জল এখনও ২-৩ দিন চলবে। অন্ডাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে মজুত জল এখনও ৪-৫ দিন চলবে। ডিএসপির জনসংযোগ আধিকারিক বেদবন্ধু রায় জানান, কারখানার মজুত জল ২-৩ দিন চলবে। টাউনশিপের জন্য সোমবার সকাল পর্যন্ত দেওয়া যাবে। সংস্থার কারিগরি প্রযুক্তি সবরকম সহযোগিতা করা হচ্ছে।

গত ২০১৭ সালের ২৪ নভেম্বর ব্যারেজের ১ নং লকগেট ভেঙে চ্যানেল থেকে বেরিয়ে বিপত্তি ঘটেছিল। তখনও জলশূন্য করা ব্যারেজ। চারদিন ধরে চলে লকগেট মেরামতের কাজ। তখনও চরম ভোগান্তির শিকার হয় শিল্পাঞ্চলবাসী। তারপর ব্যারেজের ১১ টি লকগেট নতুন করে পুনঃস্থাপনের কাজ শুরু হয়। যারমধ্যে ৪ টি পুনঃস্থাপন হয়েছে। বাকি রয়েছে ৭ টি। প্রশ্ন, বার বার ব্যারেজের লকগেট বিপর্যয় এবং মেরামতের জন্য জলশূন্য করা হয় ব্যারেজ। গোটা দেশ যখন ডিজিটাল ও প্রযুক্তির স্বপ্ন দেখছে। গঙ্গা নদীর তলায় মেট্রো চলাচলের ব্যাবস্থা হয়েছে। তখন ব্যারেজের জলশূন্য না করে লকগেট মেরামত করার পরিকল্পনা ও প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া হয় না কেন? প্রদেশ কংগ্রেসের পশ্চিম বর্ধমান জেলা সভাপতি দেবেশ চক্রবর্তীর অভিযোগ, “ব্যারেজ তৈরীর পর বিগত ৬৫ বছরে আধুনিকিকরন কিছুই হয়নি। সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে প্রযুক্তির ব্যাবহারের অগ্রগতি দরকার ছিল। বিগত তিন বছর দুবার গোটা শিল্পাঞ্চলকে ভোগান্তির মুল করান প্রযুক্তির ব্যাবহারে পরিকল্পনার অভাব। একই সঙ্গে শহরে ডিভিসি, ডিএসপির মত সংস্থা রয়েছে। তাদের সঙ্গে আলোচনা করে কারিগরি পরামর্শ নেওয়া উচিত ছিল। সমন্বয়ের অভাব রয়েছে।”

সিটু নেতা সৌরভ দত্ত বলেন, “২০১৭ সালে একবার বিপর্যয় হওয়ার পরেও ২০২০’র বিপর্যয় ঘটতে দেওয়া এবং একবার বিপর্যয় মোকাবিলায় নাকানি চোবানি খাওয়ার পরেও আবার ততটাই বা তারও বেশি নাকানি চোবানি খাওয়ায় প্রমাণ হচ্ছে যে রাজ্য ও কেন্দ্রে দুটি অপদার্থ সরকার বসে আছে এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এখানে রাজনীতির অধীনে থাকায় সভ্যতার চাকা উল্টোদিকে ঘুরছে।”

দুর্গাপুর পুরসভার মেয়র দিলীপ আগস্তী বলেন “গতবারের থেকে একটা শিক্ষা হয়েছে। তাই বিকল্প পানীয় জল সরবরাহের জন্য শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ১১ টি ডিপ টিউবয়েল করা হয়েছে। ৪০ টি ট্যাঙ্কার রাখা হয়েছে। সেখান থেকে জল নিয়ে ট্যাঙ্কার মাধ্যমে জল সরবরাহ করা হবে।” তিনি আরও বলেন, “বামফ্রন্ট ৩৪ বছর রাজ্যে শাসন করেছে। ওইসময় ব্যারেজের দেখভাল কিছুই করেনি। একটা লকগেটও বদল করেনি। তখন লকগেটগুলি সংস্কার করলে শহরবাসীকে এই বিপর্যয় হত না। গতবারের বিপর্যয়ের পর কয়েকটি লকগেট বদলের কাজও চলছে।”

Related Articles

Back to top button
Close