fbpx
পশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

শিল্পশহরে জলকষ্টে তেষ্টা মিটিয়েছে, দুর্গাপুরে প্রস্রবন জল অপচয় রোধ ও সংরক্ষনের দাবি এলাকাবাসীর

জয়দেব লাহা, দুর্গাপুর: এ যেন ফল্গু ধারা। অন্তসলিলা নদী। মাটি খুঁড়লেই উপচে পড়ছে সুস্বাদু জল। শুধু তাই নয়। আবার ওই জলস্রোতের এতটাই গতি, মেশিন ছাড়াই প্রায় এক কিলোমিটার দুরে রিজার্ভার ভর্তি হচ্ছে। ওই রিজার্ভার থেকে অবিরাম গতিতে জল পড়ছে। আর ওই পরিশ্রুত জলই একমাত্র পান করার ভরসা গ্রামবাসীদের। নজিরবীহিন প্রস্রবনটি রয়েছে দুর্গাপুর-ফরিদপুর ব্লকের সরপি গ্রামে। মিনারেল হওয়ায় কদর রয়েছে ওই জলের। জ্যারকিন ভর্তি জল বিকোচ্ছে আশপাশে গ্রাম ছাড়াও শিল্পশহরে।

দুর্গাপুর শিল্পশহর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দুরে সরপি গ্রাম। গ্রামের পাশেই খনি অঞ্চল। তাছাড়াও রয়েছে মোরাম খাদান। গ্রাম লাগোয়া রামসায়র পুকুর। প্রায় ৭ একর। সারাবছরই জলপুর্ন থাকে। ওই পুকুর পাড়ে রয়েছে প্রচীন রামেশ্বর শিব মন্দির। পুকুর লাগোয়া ফাঁকা মাঠেই রয়েছে প্রস্রবন। সামান্য মাটি খুঁড়লেই উপচে পড়ছে স্বচ্ছ জল। দেখলেই মনে হয়, যেন কোন অন্তসলিলা নদী প্রবাহমান রয়েছে। আর তাই হয়তো ফল্গু নদীর মতো মাটি খুঁড়লেই জল বেরিয়ে পড়ছে। ওই জল পরিশ্রুত ও সুস্বাদু। পরীক্ষামুলক ভাবে দেখা গেছে ওই জল পানের উপযোগী।

নব্বইয়ের দশকে বামফ্রন্টের জামানায় রামসায়ের কোল ঘেঁষে মটির মধ্যেই কংক্রিটের বাঁধানো ছোট ট্যাঙ্ক করা হয়। এবং সেখান থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দুরে গ্রাম লাগোয়া রিজার্ভার করা হয়। কোনরকম মেশিন ছাড়া নলবহিত হয়ে ওই প্রস্রবন জল রিজারভারে ভর্তি হয়। এবং ওই রিজারভারে ট্যাপকল করা হয়েছে। দিনরাত অবিরাম গতিতে পড়ছ প্রস্রবনের জল। সেখান থেকে গ্রামবাসীরা পানীয় জল নেয়। সরপি গ্রাম ছাড়াও আশপাশের উখড়া, খান্দরা, ঝাঁঝরা সহ প্রায় ১০ টি গ্রামে ওই জলের চাহিদা রয়েছে। সকাল থেকে ৫-৬ জন হকার টোটো ভ্যানে ও ২৫ জন সাইকেলে করে ওই জল বিক্রি করে। ১৫ লিটারের জার ১০ টাকা।

 

জল বিক্রেতা সুভাষ দাস জানান,” একটা সময় রোজগার ছিল না। গ্রামের কয়েকজন প্ল্যাস্টিকের জার দিয়ে সহায্য করে। তাদের বাড়ী ছাড়াও অনেক বাড়ীতেই জল পৌঁছে দিই। ২৭ টা জার আছে। সারাদিনে চারবার ট্রিপ হয়। জল বিক্রি র ওপর সংসার চলে।” ২০০৫-০৬ সালে তৎকালীন সাংসদ সুনীল খাঁ সাংসদ তহবিল থেকে সরপি গ্রামে ৬ টি জল ট্যাঙ্ক তৈরী করা হয়। এবং গ্রামের রুইদাস পাড়ায় রিজার্ভারে পাম্প বসানো হয়। ওই রিজারভার থেকে জল নলবাহিত হয়ে গ্রামে সরবরাহ হত। কিন্তু বছর কয়েক পর ওই পরিসেবা বন্ধ হয়ে পড়ে। পরে পিএইচই থেকে আলাদা প্রকল্পে নলবাহিত জল সরবরাহ শুরু করলেও, সেই জল পানে অনিহা গ্রামবাসীদের।

প্রশ্ন, রামসায়রে ফাঁকা মাঠে ওই প্রস্রবনের কারন কি? তাহলে কি অতীতে কোন নদী ওই পথ দিয়ে প্রবাহমান ছিল? রামসায়ের আশপাশে গ্রাভেলস্ খাদান রয়েছে। সেখানের গ্রাভেলস্ কুপ, নলকুপ বোরিংয়ের পর স্বচ্ছ জলের জন্য নীচে দেওয়া হয়ে থাকে। ধারনা, রামসায়ের ওই খোলামাঠ এলাকায় জলস্তর খুব কাছেই। মাঠির নীচে গ্রাভেলস্ রয়েছে। যে কারনে ভুগর্ভস্ত থেকে উপচে পড়া প্রস্রবনের জল পরিশ্রুত। গ্রামবাসীরা জানান,” বর্ষায় জলের গতি বেশী থাকে। গ্রীষ্মকালে একটু কম থাকে গতি। জল কোনরকম পাম্প ছাড়ায় রিজারভারে জমা হয়। সেখান থেকে পাইপ মাধ্যমে জল বের হয়। ওই জল বিশুদ্ধ ও পরিশ্রুত। যাকে বলা হয় খাঁটি ‘মিনারেল ওয়াটার’।”

গ্রামবাসীরা জানান, “গ্রামে পিএইচই থেকে আলাদা করে নলবাহিত জল পরিষেবা দেয়। কিন্তু নিকাশীর নীচে হওয়ায় প্রায়ই পাইপ ফুটো হয়ে নোংরা জল আসে। তাই রামসায়ের জলই গ্রামের সকলে পান করে। এবং একমাত্র ভরসা।” বাসিন্দারা জানান,” আশপাশের গ্রাম ছাড়াও শহর দুর্গাপুরের প্রচুর লোক এই জল নিয়ে যায়। লকগেট বিপর্যয়ের সময়ও এখান থেকে অনেক শহরবাসী জল নিয়ে গেছে। জোগান হয়েছে। গ্রীষ্মকালে জল নেওয়ার লাইন বেশী থাকে। রাত থেকে জল নেওয়ার লাইন পড়ে।” বাসিন্দারা জানান,” জল অপচয় বা নষ্টও হয়। তাই রামসায়ের জল সংরক্ষন করে সরকারিভাবে নলবাহিত পরিষেবা দিলে প্রচুর মানুষ যেমন উপকৃত হবে। তেমনই জলের অপচয় কম হবে।”

 

স্থানীয় বিজেপি নেতা জিতেন চ্যাটার্জী বলেন,” রাজ্য সরকারের সদিচ্ছার অভাব। প্রাকৃতিক এই প্রস্রবন জল অপচয় কমিয়ে সংরক্ষন দরকার। আমরা উদ্যোগ নিয়ে বর্তমান রিজারভারে কিছু ট্যাপ বসিয়ে দেওয়ার চিন্তাভাবনা নিয়েছি।” স্থানীয় তৃণমূল নেতা সুজিত মুখোপাধ্যায় বলেন,” বিষয়টি নজরে আছে। রামসায়ের ওই জল সংরক্ষন করে পরিষেবা দেওয়ার চিন্তাভাবনা চলছে।”

Related Articles

Back to top button
Close