fbpx
অন্যান্যঅফবিটকলকাতাহেডলাইন

তরঙ্গ কথা……

পর্ব-৩

মনীষা ভট্টাচার্য: ‘আজ যেমন করে গাইছে আকাশ, তেমনি করে গাও গো, আজ যেমন করে চাইছে আকাশ তেমনি করে  চাও গো….’ কবিগুরুর দাবি আকাশ গায়, আকাশ চায়, কিন্তু কীভাবে? পাখিরা আকাশে ওরে, তাদের কণ্ঠে গান থাকে, তাহলে পাখিদের গানই কি আকাশের গান? যদি তা ধরেও নিই, তাহলে দ্বিতীয়টা, অর্থাৎ চাওয়াটা? বাংলা ব্যকরণ মতে আকাশ ক্লীবলিঙ্গ, সে কথা বলতে পারে না, তাহলে সে চাইবে কেমন করে? হায় গো রবি ঠাকুর, এখন তুমি সামনে থাকলে না জানি কী ভালোই হতো। গানটা পাশের বাড়ি থেকে খুব ক্ষীণ স্বরে ভেসে আসছে। রেডিওতে বাজছে। আজ ঠাকুমা বাড়িতে নেই। ইস, ঠাকুমা থাকলে নিজের ঘরে বসেই শুনতে পেতুম। শরতের হাওয়ায় জানলার পর্দা উড়িয়ে নিচ্ছে। ভেসে আসছে বাতাবিলেবু ফুলের গন্ধ। বিকেলের সেই রেডিওর সুর রাতে গিয়ে উপলব্ধি ঘটালো ইথার তরঙ্গে ভেসে আসে যে গান তাই তো আকাশের গান, আর সেই গানের জন্য আমাদের অপেক্ষা করে থাকাই, তাকে মনে মনে চাওয়া। এই না হলে রবি ঠাকুর। জীবনের সব কিছুর সঙ্গে, সব কিছুর জন্যে, তিনি আছেন।

শান্তিনিকেতন আশ্রম বিদ্যালয়ে গুরুদেবের উপস্থিতিতে চলছে জ্ঞান আহরণ।

এই রবি ঠাকুর আকাশবাণীকে তাঁর শুভেচ্ছা জানিয়েই ক্ষান্ত থাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পারেন নি। আমরা   দিইনি। আকাশবাণীর মতো এক জায়গায় গীতাঞ্জলীর কবি, শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠাতা, সকলের গুরুদেব যুক্ত হবেন না, এ আবার হয় নাকি? কলকাতার বেতার তখন গৌরবের সঙ্গেই চলছে। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের স্মৃতিকথায় পাওয়া যায়, ‘সেই সময় একদিন নৃপেন্দ্রনাথ মজুমদার, আমাদের প্রোগ্রাম পরিচালক মহাশয়    বললেন, বীরেন তুমি তো সাহিত্যিকদের আড্ডায় ঘোরো, একবার রবীন্দ্রনাথকে এখানে আনতে পার? আমি আমতা আমতা করে বললুম, নেপেনদা রবীন্দ্রনাথের কাছে যাবার সৌভাগ্য আমার বহুবার হয়েছে সত্যি,  তাঁর জোড়াসাঁকোর বাড়িতে বিচিত্রা সাহিত্য বৈঠকে প্রবন্ধ, কবিতা, আবৃত্তিও দু’চারবার শুনে এসেছি…কিন্তু প্রত্যক্ষ পরিচয় করার সুযোগ তো কখনও ঘটেনি। নেপেনদা বললেন , আরে বাপু, পরিচয়ের দরকার  কী..সটান চলে যাও শান্তিনিকেতনে, সেখানে গিয়ে আমাদের আবেদনটা জানিয়ে এস।…চলে গেলুম  শান্তিনিকেতনে। ওখানে আলাপীর মধ্যে একমাত্র ছিলেন ক্ষিতিমোহন সেন মহাশয়। বিকেলে তাঁর সঙ্গে দেখা করে বললুম কী উদ্দেশ্যে শান্তিনিকেতনে এসেছি। তিনি হেসে বললেন, বীরেনবাবু, আপনার উদ্দেশ্য  এখন সফল হবে কিনা জানি না – কারণ ওঁর শরীর খুব ভালো যাচ্ছে না। তাছাড়া কিছুদিন পরেই উনি দার্জিলিং চলে যাচ্ছেন।…এখান থেকে যদি কিছু করাতে পারেন দেখুন।’

এ স্মৃতিকথা যে সময়ের, তখন রেকর্ডিং-এর যন্ত্র কলকাতায় এসে পৌঁছয়নি। তাই কবিকে স্টেশনে নিয়ে   আসা ছাড়া অন্য কোনও উপায় ছিল না। এই সাক্ষাৎকারে রবীন্দ্রনাথ বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রকে বেশ কয়েকটি কথা   বলেন।  প্রথমেই মজা করে বলেন, ‘তোমাদের এই রেডিও যন্ত্রটি ভবিষ্যতে অনেক উৎপাত বাধাবে বুঝতে  পারছি…।’ পরে বলেন, ‘আমার গানের একটা নিজস্ব সুর আছে, সেটাকে যদি কোনও শিল্পী তার খুশীমত  দল-বদল করে তাহলে মনে হয়, সকলে মিলে আমার ওপর উৎপীড়ন করছে। ও-দিকটায় একটু লক্ষ্য  রেখো তোমরা।’ এই ঘটনা সম্ভবত ১৯৩৭ সালের। এর আগের বছর মার্চ মাসে যখন রবীন্দ্রনাথ বিশ্বভারতীর   প্রয়োজনে অর্থ সংগ্রহের জন্য দিল্লি গিয়েছিলেন, তখন দিল্লি বেতার কর্তৃপক্ষের অনুরোধে বেশ কয়েকটি   কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন গুরুদেব। সেই প্রথম বেতারে কবির কণ্ঠ প্রচারিত হয়। দিল্লির সেই কবিতা  আবৃত্তি  কলকাতার মানুষের শ্রুতিগোচর হয়েছিল কিনা জানি না, তবে অশোককুমার সেনের ব্যবস্থাপনায়  ১৯৩৮ সালের রবীন্দ্র জন্মদিনের দিন কালিম্পং থেকে কবি কণ্ঠে শোনা গেল ‘জন্মদিন’ কবিতা।

পাঠরত কবিগুরু।

নাতনি নন্দিতা দেবীকে লেখা চিঠি থেকে জানতে পাওয়া যায় ১৯৩৮ সালের ২৬ বৈশাখ অর্থাৎ জন্মদিনের পরেরদিন কবি লিখছেন, ‘কাল এখানে লোক ছিল অল্প, জমেছিল বেশি। রেডিওতে আমার আবৃত্তি  শুনেছিলি তো?’ সে বছর কবির জন্মদিনে কলকাতা বেতার থেকে তাঁর বিশেষ বাণী প্রচারের জন্য তৎকালীন অস্থায়ী কেন্দ্র অধিকর্তা অশোককুমার সেন কবিকে রাজী করিয়ে ছিলেন। সেই মতো ব্যবস্থাও    শুরু হয়েছিল। জন্মদিনের কিছুদিন আগে কবি গেলেন কালিম্পং-এ। তা সত্বেও কবির জন্মদিনের বাণী  প্রচারের সিদ্ধান্তের কোনও বদল হয়নি। প্রোগ্রাম ডিরেক্টর নৃপেন মজুমদার এবং অশোককুমার সেনের  তত্ত্বাবধানে কালিম্পং থেকে কবির কণ্ঠ রিলে করার ব্যবস্থা সম্পন্ন হয়। অবশেষে নির্দিষ্ট সময় উপস্থিত হল। ঘড়ির কাটায় তখন রাত ৮টা। ঘরে একটা বেল বেজে উঠল। কবি বসলেন যন্ত্রের সামনে। এরপর একটি লাল  আলো জ্বলে উঠল, সঙ্গে সঙ্গে কবিকণ্ঠে উচ্চারিত হল ‘আজ মম জন্মদিন।…’ সেদিন কবিকণ্ঠ কলকাতা  হয়ে কালিম্পং-এ এসে ধরা দেয়।  শুধু কালিম্পং-এর মানুষ নয়, গোটা কলকাতাবাসী সেদিন আনন্দে  রোমাঞ্চিত হয়েছিল।

একবার রবীন্দ্রনাথ বেতারের জন্য ইংরেজিতে তিনটি বক্তৃতা রেকর্ড করবার প্রতিশ্রুতি দেন। বক্তৃতা লেখা শেষ হলে গুরুদেবের সেক্রেটারি জানান, অশোককুমার সেনকে। ইঞ্জিনিয়ারকে সঙ্গে নিয়ে মি. সেন এলেন  শান্তিনিকেতনে। রেকর্ড সম্পন্ন হল। সেবার অশোকবাবু কবির কাছ থেকে চিত্রঙ্গদা নৃত্যনাট্যের রেকর্ডিং  করার  সম্মতিও আদায় করে নিয়ে যান। চিত্রাঙ্গদা চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন কবি দৌহিত্রী নন্দিতা কৃপালিনী  এবং অর্জুনের ভূমিকায় নন্দলাল বসুর পুত্রবধূ। একবার শান্তিনিকেতনে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতিতে এবং তাঁর নির্দেশে অমলা বসু, ইন্দ্রলেখা ঘোষ ও কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে কয়েকটি রবীন্দ্রসংগীত রেকর্ড করেন কলকাতা বেতারের জন্য। সেই সঙ্গে ছিল প্রায় ত্রিশজন পুরুষ ও নারীর মিলিত কণ্ঠে গাওয়া ‘নীল আকাশের কোণে কোণে’ ও ‘আমাদের শান্তিনিকেতন’ গান দুটিও। অশোকবাবুর স্মৃতিকথায় পাওয়া যায় গুরুদেব নিখুঁত কাজে বিশ্বাসী  ছিলেন। তৃতীয়বারের রেকর্ডিং শুনে তবে কবি তৃপ্ত হয়েছিলেন।

এবার বলি ১৯৩৯ সালের একটি ঘটনা। কানাডিয়ান ব্রডকাস্টিং করপোরেশন ভারতবর্ষ থেকে কোনও এক  জাদুকরের ইন্টারভিউ চেয়ে পাঠান। ফিলডেন (স্টেশন ডিরেক্টর) এই প্রস্তাবে অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে তাঁদের  কলকাতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপস্থিতির কথা জানান। পাশাপাশি অশোককুমার সেনকে বলেন কানাডিয়ান   ব্রডকাস্টিং করপোরেশনের কাছে যেন অল ইন্ডিয়া রেডিওর মুখরক্ষা হয়। অশোককুমার সেনের স্মৃতিকথা  থেকে পাওয়া যাচ্ছে, স্ংক্ষুব্ধ বিশ্বে কানাডার কী ভূমিকা গ্রহণ করা উচিত তা নিয়ে বাংলায় একটি কবিতা লিখে রেকর্ড করাবেন কবিকে দিয়ে। অশোকবাবুর অনুরোধে কবি প্রথম ত্রিশ সেকেণ্ডে বাংলায় ও পরে সেই   বাংলা কবিতার ইংরেজি তর্জমা করে সেটিও পাঠ করতে রাজি হলেন। এ জন্য ফিলডেন সাহেবের কাছে  টেলিগ্রাম করে অশোকবাবু বলেন কানাডা ব্রডকাস্টিং করপোরেশন যে বিশ্বভারতীকে ১০০০ টাকা  প্রদান করে। সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সে টাকা এসে পৌঁছয় বিশ্বভারতীতে।

চেস্টার উইলিয়ামস ১০ নভেম্বর ১৯৩১ –এ গুরুদেবের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন WABC ও কলম্বিয়া নেটওয়ার্ক রেডিও-র জন্য।

বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র এক জায়গায় লিখছেন, হঠাৎ একদিন কলকাতা বেতার কেন্দ্রে খবর এলো জোড়াসাঁকোতে স্টেজ বেঁধে রবীন্দ্রনাথ ‘তপতী’ নাটক মঞ্চস্থ করবেন। খবর পেয়েই বীরেনবাবু ছুটলেন জোড়াসাঁকোতে। নাটকটির সরাসরি রিলে  করে বেতারে সম্প্রচারের অনুমতি চাইলে খুব খুশি হয়ে কবি তা দিয়েও দিলেন। কবি অভিনয় করেছিলেন রাজার ভূমিকায়। তাঁর বাচনভঙ্গী, অভিনয় সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারার। শ্রোতারা শুনে মুগ্ধ। টেলিফোনে, চিঠিতে সেই মুগ্ধতার কথা বারবার প্রকাশ পেয়েছিল সেদিন।

আকাশবাণী এবং রবীন্দ্রনাথ – এই গল্প শুরু করলে শেষ হবে না। তাই আজকের পর্ব কলেবরে আর বৃদ্ধি না করে বরং আরও একটি পর্বের জন্য অপেক্ষা করার অনুরোধ রইল। আগামী পর্বেও থাকবে আকাশবাণী ও রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কের আরও কিছু তথ্য।

কৃতজ্ঞতা: কলকাতা বেতার

(ক্রমশ…)

 

 

 

 

Related Articles

Back to top button
Close