
পর্ব-৪
মনীষা ভট্টাচার্য: সারেগা, রেগামা, গামাপা, পাধানি, ধানিসা…হারমোনিয়ামে গলা সাধছে পাশের বাড়ির বুচকি। সারগমের পর সাধারণত রবীন্দ্রসংগীতই ধরে আপামর বাঙালি। বুচকিও তাই ধরল, ‘আমার ভাঙা পথের রাঙা ধুলোয় পড়েছে কার পায়ের চিহ্ন’। এমা-আ-আ, হারমোনিয়াম বাজিয়ে রবীন্দ্রসংগীত? অবাক লাগছে প্রশ্নটা শুনে? ভাবছেন, তাই তো দেখে এসেছেন এতদিন। কিন্তু জানেন কি, গুরুদেবের ভীষণ অপছন্দ ছিল তাঁর গানের সঙ্গে হারমোনিয়াম বাজানো? অন্যান্য তথ্যের সঙ্গে আজ সেই গল্প।
১৯৩৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তৎকালীন কেন্দ্র অধিকর্তা স্টেপলটন অনেকদিনের ছুটি নেওয়ায় সেই জায়গায় অস্থায়ী স্টেশন ডিরেক্টর হিসেবে আসেন অশোককুমার সেন। তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর নিজেই ব্যবস্থা করে যান কবির সঙ্গে দেখা করতে। ড. ধীরেন্দ্রমোহন সেন সমস্ত ব্যবস্থা করে দিলেন। রবীন্দ্রনাথ তখন থাকেন উত্তরায়ণে। চায়ের আসরে অশোকবাবু কবিকে সরাসরিই জিজ্ঞেস করলেন বেতারে রবীন্দ্রসংগীতের প্রচার সম্পর্কে কবি উদাসীন কেন?
এই প্রশ্ন শুনে কবির সপ্রতিভ উত্তর ছিল, অল ইন্ডিয়া রেডিও-র স্টুডিওতে হারমোনিয়ামের দৌরাত্ম্য চলতে থাকলে তার আঘাতে তিনি রবীন্দ্রসংগীতকে হত্যা করতে দিতে মোটেই রাজি নন। কবির ক্ষোভের কথা শুনে অশোকবাবু বিনীতভাবে তাঁকে আশ্বস্ত করেন যে গুরুদেবের আপত্তি তিনি জানাবেন ফিলডেনের কাছে এবং যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন। এক বছরের মধ্যেই অল ইন্ডিয়া রেডিওর সমস্ত কেন্দ্র থেকে হারমোনিয়াম বর্জনের নির্দেশ আসে ফিলডেনের পক্ষ থেকে। এই খবর পেয়ে কবি, অশোককুমার সেনকে জানালেন, ‘ডিয়ার অশোক, আই হ্যাভ অলওয়েজ বিন ভেরি মাচ এগেইনস্ট দ্য প্রিভেলেন্ট ইউজ অব দ্য হারমোনিয়াম ফর পারপাস অব অ্যাকম্প্যানিমেন্ট ইন আওয়ার মিউজিক অ্যান্ড ইট ইজ ব্যানিশড কমপ্লিটলি আওয়ার আশ্রম। ইউ উইল বি ডুয়িং আ গ্রেট সার্ভিস টু দ্য কজ অব ইন্ডিয়ান মিউজিক ইফ ইউ ক্যান গেট ইট অ্যাবান্ডান্ড ফ্রম দ্য স্টুডিওজ অব দ্য অল ইন্ডিয়া রেডিও।’ এ চিঠির তারিখটি হল ১৭ জানুযারি, ১৯৪০।
১৯৩৯ সালে, কবির সঙ্গে যখন রেডিওর সম্পর্ক ধীরে ধীরে ভালো হচ্ছে, তখন একবার রেডিও কর্তৃপক্ষদের কবি অনুরোধ করেন শান্তিনিকেতনে কলকাতা বেতারের একটি সহায়ক স্টুডিও চালু হোক। কবির এই অনুরোধকে সাগ্রহে অনুমতি দিয়েছিলেন ফিল্ডেন সাহেব, কিন্তু ডাক ও তার বিভাগের চরম ঔদাসীন্যে সে প্রস্তাব কার্যকর হয়না। পরবর্তীতে স্বাধীনতার কয়েক মাস আগে কবির ইচ্ছার সেই বেতার স্টুডিও চালু করা হয়। গুরুদেবের জীবদ্দশাতেই কলকাতা কেন্দ্রে সম্প্রচারিত হয় ‘শেষের কবিতা’। গুরুদেব সেই নাটক শুনে খুব খুশি হয়েছিলেন। অভিনয়ে ছিলেন প্রমথেশ বড়ুয়া, যমুনা দেবী, সুপ্রভা মুখোপাধ্যায় প্রমুখ। ওই বছরই মে মাসে কবির জন্মদিনে আবার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় কবির বাণী প্রচারিত হবে। কবি সেই সময় পুরীতে। বেতার কর্তৃপক্ষ যান সেখানে। সঙ্গে ছিল কবির ভাষায় ‘ক্ষুদে শয়তান’ রেকর্ডিং মেশিন। শুরু হল রেকর্ডিং, কিন্তু নিজের আবৃত্তি শুনে কবির নিজেরই তা পছন্দ হয় না কারণ তাঁর কণ্ঠপ্রায় ঢেকে দিয়েছিল সমুদ্রের গর্জন। অশোককুমার সেন তাঁর স্মৃতিকথায় এক জায়গায় লিখছেন, ‘রবীন্দ্রনাথ এবার বেঁকে বসলেন।…কবির এই মনোভাব দেখে আমরা ভাবছিলাম এবার কী করা যায়। প্রভাত মুখোপাধ্যায় বললেন, কবি যে অসম্মত হয়েছেন এ কথাটাই রেকর্ড করে নিয়ে যাওয়া হোক। তখন আমি নিজেই কবিকে অনুরোধ করলাম। কবির সঙ্গে আমার সাক্ষাৎকার রেকর্ড করে কবিকে শোনানো হল। শুনে তিনি খানিকটা খুশি হলেন।…শেষ পর্যন্ত বাংলা ও ইংরেজিতে মিলিয়ে মোট আটটি কবিতা রেকর্ড করলেন কবি। এই রেকর্ডের একটি সেট কবিকে পরে উপহার দেওয়া হয়েছিল শান্তিনিকেতনে।’
সেই আটটি কবিতার মধ্যে একটি ছিল ‘প্রশ্ন’। সারা ভারতে তখন একদিকে মহাত্মা গান্ধীর প্রকাশ্য অহিংস আন্দোলন আর অন্যদিকে বাংলার বিপ্লবীদের সশস্ত্র বিপ্লব। চলছে ব্রিটিশের অমানুষিক অত্যাচার। এরই পরিপ্রেক্ষিতে কবি লিখেছিলেন ‘প্রশ্ন’ কবিতা। প্রথমে সেই কবিতা সম্প্রচার নিয়ে কলকাতা বেতার দ্বিধান্বিত থাকলেও, নির্দিষ্ট দিনে, বিনা বাধায় এবং বিনা দ্বিধায় কবিকণ্ঠে বেজেছিল সে কবিতা, শহরবাসী তা শুনে মুগ্ধ হয়েছিলেন।
এই ১৯৩৯ সাল কলকাতা বেতারের পক্ষে একটি উল্লেখযোগ্য বছর কারণ কবি প্রথম পা রেখেছিলেন কলকাতার ১নং গারস্টিন প্লেসের বেতার কেন্দ্রে। বেতার কেন্দ্রের প্রবেশ দ্বারে প্রায় কুড়ি ফুট বাই আট ফুট লম্বা বৃত্তের মধ্যে সবুজ সিমেন্টের একটি ভারতবর্ষের রেখাচিত্র ছিল। কবি যখন প্রবেশ করলেন বেতার কেন্দ্রে তখন তিনি সেই ভারতবর্ষের রেখাচিত্রটি দেখেন। পথ দেখিয়ে নিয়ে আসছিলেন অশোককুমার সেন এবং ডাইরেক্ট জেনারেল বোখারী সাহেব। দু’জনেই অনায়াসে সেই রেখাচিত্রের উপর দিয়ে হেঁটে চলে গেলেন। কবি বৃত্তের সামনে দাঁড়িয়ে আনত মস্তকে ভারত জননীর সিমেন্ট রচিত রেখাচিত্রটিকে প্রণাম জানিয়ে, অর্ধবৃত্তাকারে ঘুরে পথপ্রদর্শকদের অনুসরণ করেছিলেন। আসলে কবির কাছে মাটি যে মা। তাই তার উপর পা দিয়ে অনায়াসে চলে যেতে পারেননি।
রবীন্দ্রনাথ যখন যেখানে থেকেছেন সেখানেই পৌঁছে গেছে কলকাতা বেতার। তখন কবি মংপুতে। নিয়মিত শোনেন সংবাদ। কবি মৈত্রেয়ী দেবীকে বললেন, ‘তোমার কর্তৃপক্ষকে (স্বামী) ডাকো, রেডিওটা চালান, একটু শোনা যাক কটা জাহাজ ডুবল। যে লোকটা বাংলায় বলে, বলে কিন্তু বেশ।’ অন্য একদিনের কথা, সেদিন ২৫ বৈশাখ। মৈত্রেয়ী দেবীর স্বামী রবীন্দ্রনাথকে বললেন ২৫ বৈশাখ উপলক্ষে বিশেষ প্রোগ্রাম কলকাতা বেতারে এক্ষুণি শোনা যাবে। এ কথা শুনে রবীন্দ্রনাথ আনন্দিত হয়ে রেডির খুব কাছে গিয়ে বসলেন। একটি প্রবন্ধ পাঠ করা হয়েছিল। সেই পাঠ শুনে কবির মন্তব্য, ‘আজকাল বাংলা ভাষার বেশ উন্নতি হয়েছে। অনেকেই মোটামুটি লেখে ভালো। তবে এর অর্ধেকের ওপরই তো আমার কোটেশন, রবিঠাকুরের লেখা বললেও চলে। অন্য একদিন মৈত্রেয়ী দেবীকে বললেন, ইওরোপীয় সংগীত শুনছিলুম গো আর্যে কী আশ্চর্য যন্ত্রটা। কোনও সুদূর থেকে কত রাজ্য পার হয়ে ভেসে আসছে এই সুরধ্বনি।
যত দিন গেছে কবি ততই আশ্চর্য হয়েছেন এই যন্ত্র সম্পর্কে। ভেবেছেন কীভাবে দূর দেশের কথা এদেশে চলে আসে! যাই হোক ১৯৪১ সালে কবি যখন খুব অসুস্থ হলেন, জুলাই মাসে যখন কলকাতায় এলেন, অপারেশন হল, সেই সময় কবি কেমন আছেন, প্রতি ঘণ্টায় তার খবর জানাতে কলকাতা বেতার তৎপর হল। দায়িত্ব পেলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। ৬ অগাস্ট ঘণ্টায় ঘণ্টায় কবির স্বাস্থ্যের সংবাদ শ্রোতাদের কাছে ঘোষণা করা হতে লাগল। অবশেষে শ্রাবণ মধ্যাহ্নে ‘শনিবারের চিঠি’-র সম্পাদক সজনীকান্ত দাস জোড়াসাঁকো থেকে সবার প্রথম খবর দিলেন বেতারকে কবি প্রয়াত। এরপর কবির শবদেহ জোড়াসাঁকো থেকে নিমতলা মহাশ্মশানের পথে অনুগমন করতে থাকে কলকাতা বেতার। তিল ধারণের জায়গা নেই। একটি মই সংগ্রহ করে শ্মশান ঘাটের চূড়ায় উঠে মাইক্রোফোনে রেকর্ড করতে থাকেন বীরেনবাবু রবীন্দ্র শেষকৃত্যের সংবাদ। দুঃখের বিষয় সেই রেকর্ডিং সংগ্রহ করে রাখা সম্ভব হয়নি। এখানেই শেষ নয়, এই বেতারেই কবি নজরুল পড়লেন রবীন্দ্র প্রয়াণে তাঁর লেখা ‘রবিহারা’ কবিতা। শোনা যায়, সেই কবিতা পাঠ করতে করতে কবিকণ্ঠ কান্নায় বুজে এসেছিল। চিত্রগ্রাহক পরিমল গোস্বামীর স্মৃতিকথায় পাওয়া যায় সেদিনের সেই মুহূর্তের কথা। ‘…কী বিপুল বিষণ্ণতা আর শোক বিহ্বলতা বাংলার বুকে।….যখন তাঁর সত্য মৃত্যু ঘটল, তখন চিন্তা অসাড় হয়ে গিয়েছিল। রেডিওতে খবর, চোখে জলের ধারা বয়ে যাচ্ছে।….তারপর রাত্রে আবাবও রেডিও, শুধু রবীন্দ্রনাথের কথা। সুনীল রায়ের কণ্ঠে গান শুনছি, ভাসাও তরণী, হে কর্ণধার, সমুখে শান্তিপারাবার।’
সেই শান্তির মাঝেই রবি ঠাকুর আছেন আজও। আজও কলকাতা বেতার তাঁর গানকে সকলের মাঝে পৌঁছে দেবার দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। শুধু তো রবি ঠাকুর নন, কলকাতা বেতারের সঙ্গে নজরুলের সম্পর্কও ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ট। আকাশবাণীর আগামী পর্বে তাঁর কথা। আসলে বাংলা সাহিত্যে দু’জনের নাম যে একই সঙ্গে উচ্চারিত হয়, তাই কয়েনের এপিঠের কথা বললে অন্যপিঠ বাদ দিই কেমন করে!
কৃতজ্ঞতা: কলকাতা বেতার