fbpx
অন্যান্যঅফবিটকলকাতাহেডলাইন

তরঙ্গ কথা……

পর্ব-১

মনীষা ভট্টাচার্য: খস খস…আকাশবাণী…খস খস..পরবর্তী অনুষ্ঠান…খস খস…নমস্কার।  স্থানীয় সংবাদ  পড়ছি…খস খস….দুরবাবা কিছুতেই ধরা যাচ্ছে না তো। কী মুশকিল। আকাশে তো  মেঘ নেই, তাহলে এত ঝির ঝির আওয়াজ করে কেন? পরিস্কার শোনা না গেলে ভালো লাগে?

ও ঠাকুমা, কী বিড়বিড় করচ? তোমার ওই কাঠের বাস্ক চলছে না বুজি?

একদম কাঠের বাস্ক বলবি না বলে দিচ্চি। এই কাঠের বাস্ক কত ভালো ভালো খবর  দেয় জানিস? দাও দিকি, ব্যাটারিটা পাল্টে দিই। বলচি কবে থেকে একটা নতুন কিনে দিই, তা সে  কথা বুড়ির পছন্দ নয়। এবার নষ্ট হলে  কেষ্টা আর সারাতে পারবে না, এই বলে দিলুম।

ঠাকুমা নাতনির এই রাগ অভিমান নিত্যদিনের ব্যাপার। নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন ঝগড়ার কেন্দ্রবিন্দু রেডিও। হ্যাঁ রেড়িও। যার অন্য নাম আকাশবাণী। আজ আমরা সবাই এফ এম শব্দটার সঙ্গে পরিচিত। আকাশবাণীর নিজস্ব এফ এম, গোল্ড ও রেনবো রয়েছে। সারা রাত নানা কথা, নানা গান। দাদু-ঠাকুমাদের এক সময় একমাত্র সঙ্গী ছিল এই রেডিও। স্বাধীনতার আগেই বিনা তারের (বে-তার) এমন একটি যন্ত্র আবিষ্কার সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের খবর, হিটলারি শাসনের খবর, ‘আমি সুভাষ বলছি’–এমনই কত ইতিহাসের সাক্ষী এই বেতার। সেই ইতিহাসের সাগরে ডুবুরি হওয়ার লোভটা ছাড়তে পারলাম না।

সায়েন্স কলেজের অধ্যাপক শিশির মিত্র যিনি প্রথম পরীক্ষামূলক ওয়্যারলেসের ব্যবহার শুরু করেন কলকাতায়।

ইতিহাসের খোঁজই যখন করব তখন একটু আগে থেকেই শুরু করি। অপ্রাসঙ্গিক নয়, এ অনেকটা সলতে পাকানো। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তখন একাধিক নবীন বিজ্ঞানীতে ভরা। সি ভি রমন, মেঘনাদ সাহা, সত্যেন বসু আর এঁদের পাশে সব সময় যিনি আছেন তিনি হলেন উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। এই  নবীন বিজ্ঞান মণ্ডলীতে যুক্ত  হল আরেকটি নাম শিশির মিত্র। ততদিনে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন, ১৯১৬ সালে জগদীশচন্দ্র বসু এবং মার্কিন সাহেবর কল্যাণে বিনা তারে এক জাগয়া থেকে অন্য  জায়গায় খবর আদান প্রদান শুরু হয়েছে। এই গবেষক শিশির মিত্র পাড়ি দিলেন প্যারিস। চোখে পড়ল রেডিও ভালভের সার্থক ব্যবহার সংক্রান্ত এক রিপোর্ট। তিনি যোগ দিলেন ইনস্টিটিউট অব ফিজিক্স,  ইউনিভার্সিটি অব প্রফেসর গাটনের ল্যাবরেটরিতে। সেখানে তখন রেডিও ভ্যালু সারকিট নিয়ে জোড়কদমে কাজ চলছে। এই সময় তিনি স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়কে চিঠিতে লিখলেন  কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর পাঠ্যক্রমে ওয়ারলেস বিষয়টিকে অন্তর্ভূক্ত করলে ভালো  হয়। স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় সে কথা রেখেছিলেন।

কলকাতা বেতার প্রতিষ্ঠার ইতিহাস চিরস্মরণীয় নাম জে আর স্টেপলটন।

১৯১২ সালে  ভারতের সমুদ্র উপকূলে পাহারারত ব্রিটিশ নেভিগেশন কোম্পানি নৌবহরকে বেতারযন্ত্রে সুসজ্জিত করার জন্য কলকাতার হেস্টিংস স্ট্রিটে একটি অফিস খোলে। ১৯১৮ সালে সেই  অফিসের নতুন ঠিকানা হয়  কলকাতা হাইকোর্টের সামনে টেম্পল চেম্বার্সে। ১৯২২ সালে  মি. এফ. ই. রেশর তৎকালীন সরকারের কাছে, ভারতে বেতার সম্প্রচারের  অনুমতি চেয়ে চিঠি লেখেন। অনুমতি পাওয়া যায়। প্রথম ট্রান্সমিটার বসে ১৯২৩ সালে, যা পরিচিত ৫ এ এফ নামে। এদিকে শিশির মিত্র তখন  রেডিও ক্লাবের সঙ্গে  সরাসরি যুক্ত হয়েছেন। এই রেডিও ক্লাব তখন প্রতি সন্ধ্যায় অনুষ্ঠান সম্প্রচার শুরু করেছে। পাশাপাশি শিশির মিত্র তাঁর ওয়্যারলেস ল্যাবরেটরিতে আর একটি ট্রান্সমিশন বসিয়ে সেখান থেকে শুরু করলেন সম্প্রচার। শোনা যায়, বেনারস, আগ্রা এমনকী বার্মাতেও  শিশির মিত্রের ট্রান্সমিটারের সম্প্রচার শোনা যেত। ১৯২৪ সালে তৈরি হল  আরও দুটি রেডিও ক্লাব। আজকের মুম্বাই ও চেন্নাইতে। তবে প্রথম রেডিও ক্লাব এই  কলকাতার বুকেই।

কলকাতার রেডিও ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম জে আর স্টেপলটন। শিশির মিত্রের ট্রান্সমিটারের সফল সম্প্রচারের ফলে খুব উৎসাহিত হল ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন (বিবিসি)। টেম্পল চেম্বার্সে বিবিসি-র মি ওয়ালিক গড়ে তুললেন বেতার ট্রান্সমিশন স্টুডিও।  সফল  হলেন তারাও। কর্তা হলেন সেই জে আর স্টেপলটন। এই সময় স্টেপলটন চাইছিলেন নতুন কোনও জায়গায় বেতারের স্টুডিওকে গড়ে তুলতে। খোঁজ করে পাওয়া গেল। ডালহৌসি স্কোয়ারের পশ্চিমদিকে ছোট আদালতের বিপরীতে দক্ষিণমুখো রাস্তায় তৈরি হল নতুন অফিস। ঠিকানা আমাদের চেনা সেই ১নং গারস্টিন প্লেস।

১ নং গারস্টিন প্লেসে প্রথম বেতার অফিস।

১৯২৬ সালে তৈরি হল ইন্ডিয়ান ব্রডকাস্টিং কোম্পানি। ১৯৩০ সালের  এপ্রিলে  এই কোম্পানি তৎকালীন ভারতের ব্রিটিশ সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীনে চলে আসে। তৈরি হয় ইন্ডিয়ান স্টেট ব্রডকাস্টিং কোম্পানি (আই এস বি এস)। ১৯২৭  সালের  ২৬ আগস্ট থেকে কলকাতায় শুরু হয় নিয়মিত বেতার কেন্দ্র। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ছিলেন আঙুরবালা দেবী, প্রফুল্লবালা, জ্ঞানেন্দ্রপ্রসাদ গোস্বামী এবং দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর। স্টেশন ডিরেক্টরের পদে ছিলেন বিবিসির মি. সি সি ওয়ালিক। এই  ১নং গারস্টিন প্লেস থেকে কলকাতা বেতার চলে আসে আজকের বর্তমান ইডেন গার্ডেন্সে ১৯৫৮ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর।

ইডেন গার্ডেনসের পাশে আজকের আকাশবাণী ভবন।

পাশাপাশি ১৯৬০ সালে প্রকাশিত লায়োনেল ফিলডনের  (ভারতের প্রথম কন্ট্রোলার অব ব্রডকাস্টিং) আত্মজীবনী থেকে জানা যায় তৎকালীন ভাইসরয়ের সঙ্গে অনেক কথাবার্তা, ১৯৩৫ অ্যাক্টের যুক্তি, প্রতি যুক্তি দিয়ে তিনি আই এস বি এস -এর নাম পরিবর্তন করে রাখলেন অল ইন্ডিয়া রেডিও। এরও দু’দশক পর আকাশবাণী নামটি ব্যবহৃত হতে শুরু করে্। এরপর এই অল ইন্ডিয়া রেডিওতে কত ঐতিহাসিক মুহূর্ত তৈরি হয়েছে। সেই সবের কথাও জানাব, তবে আপাতত ঠাকুমার ইথার তরঙ্গকে ধরার চেষ্টায় মন দিই।

(দ্বিতীয় পর্ব আগামী রবিবার)

চলবে……

Related Articles

Back to top button
Close