fbpx
অন্যান্যপশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

পশ্চিমবঙ্গে সর্বাধিক পাট চাষ

নিজস্ব প্রতিনিধি: পাটকে সোনার আঁশ বলা হয়। খুবই গুরুত্বপূর্ণ ফসল পাট। ভারত সরকার পাট রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা রোজগার করে। শুধু পাট নয়, পাটজাত দ্রব্যও প্রচুর পরিমানে বিদেশে রফতানি করা হয়। ভারতবর্ষে পশ্চিমবাংলায় সর্বাধিক পাট চাষ করা হয়। অন্ততপক্ষে ২০ লক্ষ কৃষক পাট চাষ করে প্রচুর রোজগার করে।

অবিভক্ত বাংলায় প্রায় ১০০ শতাংস পাট উত্পাদিত হত। এখন ধরুন শুধুই পশ্চিমবঙ্গে ৫০ শতাংস এবং দেশে প্রায় ৫০ শতাংস পাট উত্পাদন করা হয়। সেজন্য পাটকে অর্থকরী ফসল বলা হয়। পাটগাছ দুরকমের হয়। ১) কোচোরাস ক্যাপসুলারিস এবং ২) কোচোরাস অলিওটোরিয়াস, বাংলায় যাকে বলে তিতো পাট ও মিঠা পাট। ইংরেজ আমলে শিবপুর বোটানিক্যাল গার্ডেনের তত্কালীন অধ্যক্ষ রক্সবার্গ দড়ির জন্য পাটচাষ করেন এবং পরিলক্ষিত হয় যে ইউরোপিও শনের পরিবর্তে অনেক সস্তায় পাটকে থলে হিসেবে ব্যবহার করা যায়। প্রথম ভারত থেকে জাহাজে ১০০ টন পাট রফতানি করা হয়েছিল।

এরপর থেকে ক্রমাগত পাটের চাহিদা বাড়তে থাকে। দেশভাগের পর দেখা যায় অধিকাংশ পাটকলই ভারতে থেকে যায়। অনেকেই আজকে অবাক হবেন গরীব মানুষরা কিছু কিছু মিঠে পাট চাষ করত খাদ্য হিসেবে। শুনলে অবাক হযে যেতে হয় পাট বেশি জমিতে প্রথম চাষ করা হয় গঙ্গার ওপারে শিবপুর বোটানিক্যাল গার্ডেনের বিরাট ফাঁকা জমিতে। মি. রক্সবার্গ খুব নামকরা কৃষি বৈজ্ঞানিক ছিলেন। ভাবা যায় একজন সাহেব ভারতবর্ষে কর্মসূত্রে এসে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পাট চাষ শুরু করেন! এখন সারা পৃথিবীতে ভারতীয পাটের আঁশ এবং পাটজাত দ্রব্যের বিস্তার ঘটেছে।

ইদানিংকালে দেখা যাচ্ছে যে পাটচাষের পরিমাণ বাড়াতে গিয়ে পাট চাষের খরচা অনেক বেড়ে গেছে। ভারতবর্ষের পাটচাষের প্রধান (বলা ভালো একমাত্র) প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ। তাছাড়া অল্প পরিমাণ পাট হয় নেপাল, ব্রেজিল প্রভৃতি দেশে। আরেকটা খবর জানাই। সমগ্র ভারতে ৬৬টা পাটকল আছে, যার মধ্যে ৫২টা পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত।

পাটের প্রস্তুতিঃ আগেই জানিয়েছিলাম দুটো প্রজাতির পাট দেখা যায়। একরকম পাট উঁচু ও মাঝারি এবং নীচু জমিতে বোনা যায়। আবার অন্যটি খরাপ্রবন, বন্যাপ্রবন প্রতিকূলতা সহ্য করতে পারে। পাট প্রাক খরিপ বা বর্ষকালীন ফসল। উষ্ণ ও আদ্র আবহাওয়া পাটচাষের পক্ষে অনুকুল। পাটগাছ তৈরি হওয়ার পরে মাঝে মাঝে রৌদ্র এবং মাঝে মধ্যে বৃষ্টি হল অনুকুল পরিবেশ। সেই সময় পাট বৃদ্ধি পায়। এঁটেল এবং দোয়াশ দুরকম মাটিতেই পাটগাছ ভালোভাবে বেড়ে ওঠে। পাটগাছ চারা অবস্থায় জমিতে জল দাঁড়ালে ফসলের বৃদ্ধি ব্যহত হয়।

রোপনের সময়: পাট সাধারণত মে মাসে বোনা হয়। ক্ষেত্র বিশেষে জুন মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত বোনা যায়। পাট রোপনের আগে ৫-৬ বার চাষ ও মই দিয়ে জমি তৈরি করা হয়। এ সময় জমির উবর্বরতা বৃদ্ধির জন্য গোবর, আবর্জনা সার, জৈব সার প্রয়োগ করা প্রয়োজন।

সার প্রয়োগ: অগাস্ট মাসের শেষের দিকে পাটের ক্ষেত্রে ইউরিয়া দিয়ে প্রথম চাপান বা টপ ড্রেসিং করা হয়। মাটি দিয়ে অম্লাক্ত হয় তার হেক্টর প্রতি ১০ কুইন্টাল চুন প্রয়োগ করা উচিৎ। তাতে জমি ব্যালাসড থাকবে।

সারের মাত্রা: ক্যাপসুলারিজ পাট হেক্টর প্রতি ৫০ কেজি নাইেট্রোজেন ২০ কেজি ফসফেট এবং ২০ কেজি পটাস প্রয়োগ করা দরকার। অর্ধেক নাইট্রোজেন চারা বের হওযার ৩-৪ সপ্তাহ পরে অর্থাৎ অগাস্ট মাসে প্রয়োগ করা প্রয়োজন চাপান সার হিসেবে। বাকি অর্ধেক নাইট্রোজেন চাপান রোপন করার ডেড় মাস পরে প্রয়োগ

করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। নাইট্রোজেনের সম পরিমান পটাস সার প্রয়োগ করলে পাটের শিকড় রোগের আক্রমণ প্রতিরোধ করে। বৃষ্টি বা খরার সময় অথবা আগাছা হলে কিছুটা ইউরিয়া জলে গুলে পাটের পাতায় ছিটোলে ভালো। ১০-১৫ দিন অন্তর আরেকবার ছিটোতে হবে। হেক্টর পিছু ১৫ কেজি ইউরিয়া ৭৫০ লিটার জলে গুলে স্প্রে করতে হবে। কলকাতার সন্নিকটে ব্যারাকপুরে কেন্দ্রীয় পাট গবেষণা কেন্দ্রে ডাল

আঁশযুক্ত কয়েকটি উন্নত জাতের পাট আবিস্কৃত হয়।

ক্যাপুসুলারিজ (তিতা পাট)

১) সোনালী (জে. আর. সি. ৩২১), ) ঢাকাই (ডি-১৫৪) সবুজ সোনা (জে. আর. সি ২১২) ইত্যাদি জাতগুলো ভালো ফলন দেয়। অলিটারিয়াস (মিঠা পাট)- ১) চৈতালী (জে. আর. ও ৮৭৮), বৈশাখি (জে. আর. ও ৬৩২), নবীন (জে.আর.৫২৪) এগুলো ভালো আঁশ দেয়।

উন্নত জাতের বীজ সংগ্রহ করা প্রয়োজন। বোনার পূর্বে ২৫ গ্রাম মনোসান ঔষুধ মিশিয়ে শোধন করে বোনা উচিত। তাহলে পাট রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম থাকে। লাইনে পাট চাষ করলে, চাষের খরচা অনেক কম হয় এবং ফলনও বেশি হয়। বীজ বপন যন্ত্রের সাহায্যে বুনলে পাট বীজের পরিমান কম লাগে। তার সঙ্গে জমিতে নিড়ানি দেওয়ার খরচাও কম লাগে। কেন্দ্রীয় সরকার পাটের আঁশের উন্নতির জন্য একটি ফাঙ্গাস আবিস্কার করে যার নাম ফাঙ্গাল কালচার অ্যান্ড জুট। এই ফাঙ্গাসটি কলকাতার এক কৃষি বিজ্ঞানীকে দেওয়া হয় ট্রাস্ফার অব টেকনোলজির মাধ্যমে।

 

বীজের সঙ্গে অল্প পরিমান এই ফাঙ্গাসটি মিশিয়ে দিলে চতুর্থ গ্রেডের আঁশ তৃতীয় গ্রেডের সমান হয় এবং তৃতীয় গ্রেডের আঁশ দ্বিতীয় গ্রেডে উঠে আসে। চাষিভাইরা ভালো দাম পায়। যাঁকে কেন্দ্রীয় সরকার এই ট্রানস্ফার অব টেকনোলজির দাযিত্ব দিয়েছে, তিনি ‘যুগশঙ্খ’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। আঁশ ছাড়াবার পরে প্রতিটি আঁটির আঁশ পরিস্কার জলে ভালোভাবে ধোয়া দরকার। এতে আঁশের রং খুব ভালো হয়। পশ্চিমবঙ্গ, বিহারে শাখাবহুল গাছে প্রচুর বীজ তৈরি হয়। ক্যাপসুলারিজ পাট থেকে ৪-৫ কুইন্টাল ও অলিটারিয়াস পাট থেকে ৩-৪ কুইন্টাল বীজ পাওয়া যায় যা পরের বছরে চাষিভাইদের কাজে লাগবে। মনে রাখবেন, পাটের দৃঢ়তা, ঔজ্জ্বল্য এবং বর্ণ পাটের মিলের কাছে দাম পাওয়ার ব্যাপারে খুবই প্রয়োজনীয়।

Related Articles

Back to top button
Close