fbpx
গুরুত্বপূর্ণব্লগহেডলাইন

পশ্চিমবঙ্গ এখন ইসলামি সন্ত্রাসবাদের নতুন কেন্দ্র…

মোহিত রায়: যুক্ত বাংলার ও পরে পূর্ব পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিবিদ ও লেখক আবুল মনসুর আহমেদের (১৮৯৮ – ১৯৭৯) বিখ্যাত আত্মজীবনী ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ শুরুই হয়েছে একেবারে শিশুকালের জেহাদের স্মৃতি দিয়ে। লিখেছেন – “তবে আমরা নাজায়েয গান গাইয়া গলা ফাটাইতাম না। গানের বদলে আমরা গলা সাফ করিতাম ফারসী গজল গাইয়া, বয়েত যিকির করিয়া এবং পাঠ্য-পুস্তকের কবিতা ও পুঁথির পয়ার আবির্তি (আবৃত্তি) করিয়া। এ সবের মধ্যে যে পয়ারটি আমার কচি বুকে বিজলি ছুটাইত এবং আজো এই বুড়া হাড়ে যার রেশ বাজে তা এই :
আল্লা যদি করে ভাই লাহোরে যাইব
হুথায় শিখের সঙ্গে জেহাদ করিব।
জিতিলে হইব গাজি মরিলে শহিদ
জানের বদলে জিন্দা রহিবে তৌহিদ”। (মূল বানান অপরিবর্তিত)
সেই ট্র্যাডিশন আজও চলেছে।
লন্ডনের রোশানারা চৌধুরীর নাম হয়ত পশ্চিমবঙ্গবাসীদের মনে নেই। যারা দুই বাংলা নামক একটি ভূখণ্ডের সবাইকে বাঙালী নামে অভিহিত করে গর্ব অনুভব করেন, তারা গর্ব করতে পারেন যে এই রোশানারা একজন বাঙালী আদতে বাংলাদেশী। সদ্য তরুণী রোশানারা অবশ্য ব্রিটিশ নাগরিক, এখন যাবজ্জীবন জেল খাটছেন সেখানেই। কারণ কলেজ পড়ুয়া রোশানারা ইসলামি জিহাদের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ২০১০ সালের ১৪ মে তার অঞ্চলের সাংসদ স্টিফেন টিমসকে ছুরি দিয়ে আঘাত করে মারতে যান।
বিলেতে হয়ে গেলে আমেরিকাতেই বা বাংলাদেশি জিহাদ পিছিয়ে থাকবে কেন। সেখানে ২০১৭ সালে বাংলাদেশি আকায়েদ উল্লা টাইমস স্কোয়ার মেট্রো স্টেশনে বোম ফাটাতে গিয়ে নিজেই আহত হয়, এখন জেলে। ২০১৯ সালের ৭ জুন নিউইয়র্ক শহরে ধরা পড়ে ২২ বছরের বাংলাদেশি জেহাদি আশিকুল আলম। সে বেশ কিছুদিন ধরেই নিউইয়র্কের প্রসিদ্ধ টাইমস স্কোয়ারে বোমা বিস্ফোরণের প্রস্তুতি চালাচ্ছিল। নিখুঁত বন্দুক চালানোর জন্য সে চোখে লেজার অস্ত্রোপচার করিয়েছিল।

বিলেত আমেরিকায় যারা জিহাদ রপ্তানি করে, তাদের পড়শি তারা কি অবহেলা করতে পারে? তাছাড়া বাংলাদেশের অনেকেই লেবেনস্রম তত্ত্বে বিশ্বাসী, পশ্চিমবঙ্গকে তাদের ন্যায্য বিচরণভূমি হিসেবেই মনে করেন। ফলে পশ্চিমবঙ্গ ইসলামি সন্ত্রাসবাদের নতুন কেন্দ্র হওয়াটা আশ্চর্যজনক নয়। এ ব্যাপারে পরে আলোচনায় আসব। তার আগে দেখে নেওয়া যাক বাংলাদেশের সাম্প্রতিক জেহাদি কর্মকাণ্ডের এক ঝলক। সাউথ এশিয়া টেররিজম পোর্টাল-এর অসম্পূর্ণ তথ্য অনু্যায়ী বাংলাদেশে ২০১৯ সালে ৭৬ জন জেএমবি (জামাতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ), ৭০ জন ইসলামি ছাত্র শিবির, ৩৬ জন আনসার আল-ইসলাম, ৩১ জন আল্লার দল, ২৯ জন হিজাবুত তাহির, ২৫ জন আনসারুল্লা বাংলা, ৯ জন হুজি বাংলাদেশ, ৩ জন জামাতুল মুস্লিমিন সহ ২৭৯ জন জেহাদীকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০১৮ তে গ্রেফতার হয়েছিল ৫৬০ জন। পুলিশের গুলিতে জেহাদি মৃত্যুর সংখ্যা ২০১৯এ ২ জন, ২০১৮তে ১৫ জন, ২০১৭তে ৭১ জন। এই হচ্ছে সোনার বাংলা।

কদিন আগে, ১৯ সেপ্টেম্বর, একসঙ্গে নয় জন পশ্চিমবঙ্গের বাংলাভাষী (এদের বাঙ্গালি বলতে লজ্জা লাগে) ইসলামি জেহাদি গ্রেফতার করল জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা (এনআইএ)। ছয় জনকে গ্রেফতার করা হল মুর্শিদাবাদ থেকে, এদেরই দোস্ত তিনজনকে গ্রেফতার করা হল কেরলের এর্ণাকুলাম থেকে। পশ্চিমবঙ্গ ও কেরলে – দুটিই বামপন্থী ও ইসলামিদের ঘাঁটি। দুজনের মধ্যে মিত্রতাও যথেষ্ট। দুই প্রদেশেই হিন্দু জনসংখ্যা ক্রমশ হ্রাসমান। এদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ইসলামি গোষ্ঠী আল কায়দার যোগ রয়েছে। অস্ত্রশস্ত্র, নাশকতা ইত্যাদি বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু এসবের বিশদ বিবরণে যাব না কারণ কয়েকদিনে আলোচনা সব সংবাদপত্রে চলবে, তারপর সবাই চুপ করবে। যেমন বছর খানেক আগে ২৫ জুন ২০১৯এ, কলকাতা পুলিশ চারজন ইসলামি সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করে, এর মধ্যে তিনজন ছিল বাংলাদেশি। সে কথা সবাই প্রায় ভুলেই গেছে।

আরও পড়ুন:রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নির্দেশ অমান্য করে ঋণ শোধ করতে না পারা মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি ঋণদানকারী সংস্থার!

গত একবছরে পশ্চিমবঙ্গ থেকে ১৯ জন জেহাদিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এরা প্রায় সবাই জেএমবি (জামাতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ)র সদস্য। এর মধ্যে রয়েছে ২১ মার্চ ২০২০তে গ্রেফতার হওয়া তানিয়া পারভিন। এই মেয়েটি স্নাতকোত্তর ছাত্রী, লস্করে তৈবার সঙ্গে ছিল তার যোগাযোগ। আরও তাক লাগানো খবর ধনিয়াখালির আয়েশা জান্নাত মোহানার। আদতে ধনিয়াখালির মেয়ে প্রজ্ঞা দেবনাথ চার বছর ধরে নিখোঁজ, তারপর দেখা গেল পশ্চিমবঙ্গের জেহাদিচক্র তাকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করে, নাম পরিবর্তিত করে জেহাদি বানায়। সেই কাজে সে ধরা পরে ঢাকা পুলিশের হাতে।

এইরকম খবর অনেক কিন্তু তাতে কি পশ্চিমবঙ্গের তথাকথিত সুশীল সমাজের কিছু আসে যায়? বরিশালের উদ্বাস্তু বাংলার সবচেয়ে বর্ষীয়ান প্রখ্যাত কবি যিনি সুদূর উত্তরপ্রদেশের কোন গরুচোরের দুর্দশায় কাতর হয়ে কলম ধরেন তিনি কি কখনও ইসলামি সন্ত্রাসবাদ নিয়ে কিছু বলেন? বা এই যে গরীব ঘরের মেয়েগুলি জেহাদি হয়ে যাচ্ছে তা নিয়ে কিছু? না। কেন্দ্রীয় সরকারের টাকায় চলা সংখ্যাতত্বের গবেষণা কেন্দ্র থেকে বা সিপিএমের অধ্যাপকের সমাজবিদ্যার বাগিচা থেকে নিত্য দুনিয়ার সব বিষয়ে বাজারি সংবাদপত্রে নিবন্ধ প্রকাশ হয় কিন্তু এইসব তানিয়া, আয়েশা বা ইসলামি সন্ত্রাসবাদ নিয়ে নৈব নৈব চ। আর পশ্চিমবঙ্গের সেই বামপন্থী বা তৃণমূলী সভার মঞ্চে কাতারে দাঁড়ানো বুদ্ধিজীবি বা বিদ্বজ্জনেরা – যাঁরা যে কোনও ঘটনার প্রসঙ্গে মতামত দিতে দেরি করেন না, তাঁরা ইসলামী জেহাদি প্রসঙ্গ এলেই মূক-বধির হয়ে যান। এছাড়া এইসব গ্রেফতার বা খাগড়াগড়ের মতো বিস্ফোরণ – এসব কিছুকে সাফসুতরো করতে শুরু হয় বিষয়টিকে লঘু করার সাংবাদিক ক্রীড়া। পাড়ার সবাই জানতেন জেহাদীরা খুব ভালো ছেলে, কেউ কোনদিন কোন কিছু লক্ষ্য করে নি, মা বলছেন তার ছেলে একাজ করতেই পারে না। সুতরাং দুএকদিনের কোন ঘটনার খবর ছাড়া পরিকল্পিতভাবে ইসলামি জেহাদি সন্ত্রাসের আলোচনা স্তব্ধ করে রাখলে জেহাদিরা বোঝে তাদের জন্য জমি তৈরি করতে এই বিকৃত সুশীল সমাজও সঙ্গী।

দুএকজন জেহাদিদের মাঝে মধ্যে ধরা পড়া, কখনও খাগড়াগড়ের মতো বিস্ফোরণ এসব মুখরোচক সংবাদ হিসেবে চলে যায়। কিন্তু কেন পশ্চিমবঙ্গ দিনে দিনে ইসলামী সন্ত্রাসের কেন্দ্রে হয়ে দাঁড়াচ্ছে তা নিয়ে আলোচনা করা এ রাজ্যে বিপজ্জনক মনে হয়। আমরা এখন দু-এক কথা বলব সেই আলোচনাতেই। ইসলামি জেহাদিদের বেড়ে ওঠার জন্য চাই নিরাপদ বাসভূমি ও জনবল। ১৯৭৭ পরবর্তী বামপন্থী আমলে বাংলাদেশি মুসলমান অনুপ্রবেশ পশ্চিমবঙ্গের ধর্মীয় জনবিন্যাসে আনে বিপর্যয়। ১৯৯২ সালের অক্টোবরের গণশক্তির এক প্রবন্ধে মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু নিজেই এই কথা স্বীকার করেছেন। ২০০২ সালে জানুয়ারি মাসে মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বলেছিলেন মাদ্রাসাগুলি সন্ত্রাসের কেন্দ্র, পরে অবশ্য ঢোক গিলেছেন। ২০০৭এর ২২ নভেম্বর, ইসলামি মৌলবাদীদের কথা মেনে সাহিত্যিক তসলিমা নাসরিনকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিতাড়িত করল কম্যুনিস্ট সরকার। ৬ মে, ২০১১, পৃথিবীর কুখ্যাততম ইসলামি সন্ত্রাসী ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুর পর তার জন্য কলকাতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি ধর্মীয় প্রধান টিপু সুলতান মসজিদের ইমাম বরকতী মসজিদে প্রার্থনার আয়োজন করলেন। ৩১ মার্চ ২০১৩, কলকাতা ময়দানে বাংলাদেশের একাত্তরের গণহত্যাকারীদের সমর্থনে বিরাট জনসভা হল। এই তালিকা দীর্ঘ, তবু তো ইমাম ভাতা, মাদ্রাসা শিক্ষার বিপুল আয়োজন, দুর্গা সরস্বতী পুজোয় বাধা – এসব মনেই করাচ্ছি না। তবে জনসমক্ষে ১৩ থেকে ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯ তিনদিন ব্যাপী পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে জেহাদি ধ্বংসলীলার কথা বলতেই হবে। এরপর পশ্চিমবঙ্গ ইসলামি সন্ত্রাসের কেন্দ্র না হওয়াটাই হবে অষ্টম আশ্চর্য।

আরও পড়ুন:কিউবার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা ট্রাম্পের
আপাতত মাঝে মাঝে দুএকটা গ্রেফতার ছাড়া ইসলামি জেহাদের বাড়বাড়ন্ত চলতেই থাকবে। সামনে নির্বাচন, মুখে দুপাঁচটা গরম কথা বললেও কোন রাজনৈতিক দল, হ্যাঁ, কোন রাজনৈতিক দলই তাদের প্রস্তাবে এই ইসলামি জেহাদের কথা উত্থাপন করেনি। আর সাধু বাবারা নামগান নিয়েই ব্যস্ত। আরও জেহাদি সন্ত্রাসের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আর কি করার আছে।

(মতামত ব্যক্তিগত)

Related Articles

Back to top button
Close