fbpx
আন্তর্জাতিকগুরুত্বপূর্ণদেশব্লগহেডলাইন

ভারত-চিন যুদ্ধ বাঁধলে বাংলাদেশ কোন দিকে যাবে?

শিতাংশু গুহ, ২০ জুন ২০২০, নিউইয়র্ক: লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকা জানিয়েছে ভারত ও চিন মূলত হাতাহাতি, লাঠালাঠি বা পাথর ছোঁড়াছুড়ি করে আদিম কালের মত মল্লযুদ্ধ করেছে এবং উভয় পক্ষে ক্ষয়ক্ষতি ব্যাপক। কোনও পক্ষ বন্ধুক ব্যবহার করেনি। মল্লযুদ্ধ হয়েছে পাহাড়ের ওপর, গার্ডিয়ান বলেছে, ৬০ বছরের মধ্যে প্রায় সবাই হিমালয়ের কিনারা থেকে পড়ে গিয়ে এই যুদ্ধে হতাহত হয়েছেন। ভারত বলেছে, তাঁদের ২০জন সৈন্য বীরগতি প্রাপ্ত হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এ ঘটনার পর তাঁর প্রথম প্রতিক্রিয়ার শুরুতে দুই মিনিট নীরবতা পালন করে বলেছেন, ভারত এর প্রতিটি ইঞ্চি ভূমি রক্ষা করতে সক্ষম। তিনি বলেন, আমি ভারতবাসীকে নিশ্চিত করতে চাই, জোয়ানদের রক্ত বৃথা যাবে না।

গার্ডিয়ান ভারতীয় মিডিয়া’র বরাত দিয়ে জানিয়েছে যে, ৫০জন চিনা সৈন্য নিহত হয়েছে। এনডিটিভি ৪৩জন চিনা সৈন্য নিহতের কথা জানিয়েছে। চিনা সরকারি টিভি সীমান্তে সংঘর্ষ নিয়ে কোনও কথা বলেনি। সংঘর্ষের জন্যে উভয় পক্ষ একে অপরকে দায়ী করছে। ভারত বলেছেন, ‘পরিকল্পিত হত্যাকান্ড’। চিন বলেছে, ভারতীয় সৈন্য আমাদের সীমান্তে ঢুকে পড়েছিলো, তাই সংঘাত।

মার্কিন ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, হিমালয়ের পর্বত চূড়ায় দুইপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। ভারত এর ২০জন সৈন্য নিহতের কথা জানিয়েছে। চিন ঘটনার সত্যতার কথা স্বীকার করে উভয় পক্ষে ক্ষয়ক্ষতির কথা বলেছে, তবে কোন সংখ্যা জানায়নি। পত্রিকাটি বলেছে, ১৯৭৫’র পর এই প্রথম ভারত-চিন সীমান্তে একত্রে এত সৈন্য মারা গেল। চিনা সরকার নিয়ন্ত্রিত পত্রিকা ‘গ্লোবাল টাইমস’ স্বীকার করেছে পিএলএ’র ব্যাপক হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে কোন সংখ্যা বলেনি। পত্রিকা সম্পাদক হুঁ জিজিন এক টুইটে ভারতকে ‘হটকারী’ পদক্ষেপ না নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, চিনকে দুর্বল ভাবার কোন কারণ নেই? তিনি আরও বলেন, “চীন ভারতের সাথে যুদ্ধ চায়না, তবে আমরা ভীত নই”। চিনের বিদেশমন্ত্রী ভারতকে দোষারুপ করে বলেছেন, ভারত প্রথমে চীনা সৈন্যদের আক্রমণ করেছে। ভারত বলেছে, গ্যালোয়ান রিভার ভ্যালীতে ‘স্থিতাবস্থা’ ভেঙ্গে চীন ৬ই জুনের চুক্তি লংঘন করে ভারতের ভেতরে ঢুকে পড়েছিলো।

সীমান্তে আসলে কি ঘটেছিল? জানা যায়, ভারতীয় সৈন্যরা সীমান্তে টহল দিতে গিয়ে দেখতে পায় যে, চিনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) ৬ই জুন চুক্তি অনুযায়ী যেখানে থাকার কথা, সেখানে নেই, বরং কিছুটা ভারতের অভ্যন্তরে ঢুকে গেছে। ভারতীয় সৈন্যরা চ্যালেঞ্জ করে, বিবাদ বাঁধে। মল্লযুদ্ধের শুরুতে একজন ভারতীয় অফিসার খাদে পরে নিহত হন। ভারত রিইনফোর্সমেন্ট পাঠায়, দুইপক্ষ তুমুল সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। মিডিয়া জানায়, লাদাখের সুউচ্চ গ্যালোয়ান রিভার ভ্যালিতে দুই পক্ষের অন্তত: ৬শ’ সৈন্য হাতাহাতি যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এই যুদ্ধে একটি গুলি ফুটেনি, কোন আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহৃত হয়নি। কোন বিস্ফোরণ ঘটেনি। কেন শুধু হাতাহাতি? ১৯৯৬ সালে ভারত-চীন ‘আস্থাবর্ধক ব্যবস্থাপত্র’ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, সেই চুক্তি অনুযায়ী ওই অঞ্চলে ফ্রন্ট লাইনে সেনাদের হাতে কোন অস্ত্র ছিলো না। অফিসারদের হাতে অস্ত্র থাকলেও সেটি’র নল মাটির দিকে থাকার কথা।

চিন কেন এই সংঘর্ষ ঘটালো? করোনা ভাইরাসের কারণে বিশ্ব ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে চিনের দিকে তাঁকিয়ে আছে, সেই দৃষ্টি থেকে নজর অন্যত্র সরাতে কি এ আক্রমণ? করোনা বা ‘চিনা ভাইরাস’র কারণে চীনে বিদেশী বিনিয়োগ দ্রুত কমছে, এবং এর সিংহভাগ আসছে ভারতে, চিন এতে বেজায় চটা? বিশ্বব্যাপী চিনের পণ্যের চাহিদা ব্যাপক হ্রাস পেয়েছে, চাহিদা আরও কমবে, চিন এতে চিন্তিত, দোষ ভারতের।

এসব কারণে চিনের অর্থনীতিতে টান পড়ছে, তাই দৃষ্টি অন্যত্র সরানো দরকার? যুদ্ধ হলে চিনের অর্থনৈতিক অবস্থা আরো নড়বড়ে হবে, ভারতেরও সমস্যা হবে। তাই পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের সম্ভবনা কম! করোনা পেনডেমিকে ক্ষতিগ্রস্থ অর্থনীতি যুদ্ধের ফলে আরো বিপর্যস্ত হবে! সামরিক দিক থেকে দুই দেশ উনিশ-বিশ হলেও এ যুদ্ধে কেউ চূড়ান্তভাবে জয়ী হবেনা। উভয় পক্ষে ব্যাপক হতাহত, ক্ষয়ক্ষতি হবে। ১৯৬২-তে চিন জিতেছিল, এবার পাল্টা মার্ খেতে হবে। ৬২’র নেহেরুর ভারত আর ২০২০’র মোদির ভারত এক কথা নয়? দুই সুপার পাওয়ার যুদ্ধ করবে, এটা ভাবাটা বোকামি, তবে সীমান্ত সংঘর্ষ আরও ঘটতে পারে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চিন বন্ধুহীন। পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা বা আফ্রিকার কিছু দেশের সঙ্গে চিনের সম্পর্ক, ‘মনিব-চাকরের’। বিশ্ব ভারতের দিকে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, অস্টেলিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া’র সমর্থন ভারত পাবে। রাশিয়া বিপক্ষে যাওয়ার কোন কারণ নেই। মুসলিম বিশ্বের কিছু দেশ চিনকে সমর্থন দেবে, যদিও সৌদি আরব ও ইরান ভারতের পক্ষে থাকার সম্ভবনা। পাকিস্তান ডিস্টার্ব করবে। শ্রীলঙ্কা বা নেপাল নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নেই? ভারতের উচিত হবে সাউদার্ন চীন সাগরের দেশগুলোর কূটনৈতিক সমর্থন আদায় করা। ভারত-চীন যুদ্ধ বাধলে তা শুধু দু’টি দেশে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে! যা, ভারত, চীন বা কারো জন্যেই সুখকর হবে না। এর চেয়ে বরং ভারত অর্থনৈতিকভাবে চিনকে একঘরে করার উদ্যোগ নিতে পারে? বিশ্বে চিনা পণ্যের শূন্য স্থান পূরণ করার এই সুযোগ। ভারতবাসী চিনা পণ্য বর্জন বা সরকার আমদানি নিষিদ্ধ করতে পারেন। চিন ভারতের বাজার হারালে তা হবে বিরাট আঘাত।

বাংলাদেশ কোন পক্ষ নেবে? বাংলাদেশ ইতিমধ্যে একটি বিবৃতি দিয়েছে, যাতে মূলত উভয় দেশকে শান্তির পক্ষে সংযত হবার আহবান জানিয়েছে। পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ বাঁধলে বাংলাদেশ ‘নিরপেক্ষ’ থাকতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত ভারতকে সমর্থন দিতে হবে? কারণ চাপ থাকবে, বিশেষত: আমেরিকা ও সৌদি আরবের চাপ থাকবে। বাংলাদেশের জনগণ বেশিরভাগ ‘এন্টি-ইন্ডিয়ান’? তবে স্বাধীনতা যুদ্ধের কথা মনে থাকলে বা কৃতজ্ঞতা বোধ থেকে বাংলাদেশকে ভারতের প্রতি সমর্থন দেওয়া উচিত।

ভারত একাত্তরে আমাদের স্বাধীনতা দোর্-গোড়ায় পৌঁছে দিয়েছে, ভারতীয় কয়েক হাজার সৈন্য প্রাণ দিয়েছে। জনগণ সর্বাত্মক সহায়তা দিয়েছেন, আমাদের আপন করে নিয়েছেন। চিন প্রত্যক্ষ বিরোধিতা করেছে। পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করেছে। জাতিসংঘ স্বীকৃতি দিতে চাইলে চিন তিনবার ভেটো দিয়েছে। বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর? এরপর চিন কি করে বাংলাদেশের বন্ধু হয়? চীন আসলে কারও বন্ধু নয়!! শ্রীলঙ্কা এটি বুঝতে পারছে, নেপাল বুঝতে শুরু করেছে।

(লেখকের মতামত নিজস্ব)

 

Related Articles

Back to top button
Close