fbpx
গুরুত্বপূর্ণব্লগহেডলাইন

বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে কিসের রোল মডেল, বলবেন কি আপনি?

পি. আর. প্ল্যাসিড, জাপান: বিদ্যা + আনন্দ = বিদ্যানন্দ, এটি বাংলা ব্যাকরণ ক্লাসে শিখেছি। সন্ধিবিচ্ছেদ করেছি এমন অনেক শব্দের। এই শব্দের সঙ্গে মিল রয়েছে কিছু নামের, যেমন- বিবেকানন্দ, নিরানন্দ, সুধানন্দ আরও কত কি? এগুলো হিন্দু ধর্ম শিক্ষা ক্লাসে শিখিনি। হতে পারে এর কিছু শব্দ হিন্দুদের নাম হিসেবে ব্যবহার করা হয়। শব্দগুলো খাঁটি বাংলা। যদিও শুনেছি স্বাধীনতাযুদ্ধকালে এ ধরনের নাম যাদের, তাদের হিন্দু বলেই চিহ্নিত করা হত এবং বলা হতো এগুলো হিন্দু নাম। তার মানে তারা বলতে চেয়েছিল- হিন্দু মানেই বাংলা ও বাঙালি। এটিকে ঘুরিয়ে যদি বলি তাহলে বলতে পারি, হিন্দু মানে বাঙালি, সেই একই কথা।

এগুলো বলতো সাধারণত পাকিস্তানিদের পক্ষের লোকেরা। যাদের আমরা এখনও স্বাধীন দেশে রাজাকার-আলবদর বলে জানি।

এই দেশ এখন পাকিস্তানের অংশ নয়। দেশে এখন পাকিস্তানিরা না থাকলেও ওদের ভক্ত, সমর্থক ও প্রজন্ম রয়েছে। এই দেশ এখন স্বাধীন বাংলাদেশ। বাংলা ও ভাষার মধ্যেই মূলত এই দেশটির জন্মের সূত্র। তাহলে ওরা এই বাংলায় থেকে এই বাংলার জল খেয়ে, এই বাংলার আলো-বাতাসে বড় হয়ে, এখনও পাকিস্তানপ্রীতি প্রদর্শন করছে, ত কি শোভনীয়?

এই দেশের নাগরিক এই দেশকে ভালোবাসবে, এই দেশের মানুষের ভালোমন্দ নিয়ে ভাববে, এটাও যদি হয়ে যায় দোষণীয় বা অপরাধযোগ্য, তাহলে স্বভাবতই মনে প্রশ্ন জাগে- অমুসলিমরা এই দেশে জন্মেছে বলেই কি অপরাধ করেছে? এটাই কি বর্তমান রাষ্ট্রের বক্তব্য?

৯১% মুসলিমের দেশে কেউ কি জোর গলায় বলতে পারবে এই দেশের মানুষ ঘুষ খায় না, চুরি করে না, ডাকাতি করে না, ধর্ষণ করে না, খুন করে না? যদি এই দেশের মানুষ তা করেই থাকে, তাহলে প্রশ্ন এসব কি ৯% লোকগুলো করে? আমি উল্লেখিত ৯১% মানুষকে অপরাধী বলছি না। বলছি, করছে যারা, তাদের কেন রাষ্ট্র থামানোর ব্যবস্থা করছে না? না থামানোর পিছনে স্বার্থ কার এবং কিসের?

ভারতের দিকে একবার তাকিয়ে দেখলে বোঝা যায়, বাঙালি যে ক’জন বিভিন্নভাবে প্রতিষ্ঠিত, এদের প্রত্যেকেই প্রায় একসময় এ দেশের মানুষ ছিলেন। কোনও কারণে ভিটে-মাটি-সম্পদ- সব ফেলে রেখে চলে গিয়েছিলেন ওপার বাংলায়। তারা এ দেশে থাকলে কি আমরা বিদ্যাবুদ্ধিতে কোনও অংশে কম লাভবান হতাম? যারা সব কিছুর পরেও রয়ে গেছেন, তারাও যেন এই দেশে না থাকতে পারে, সে ব্যবস্থাই যেনে হচ্ছে পর্যায়ক্রমে। কথাটি শুনতে খারাপ শোনালেও যারা ভুক্তভোগী, তারাই কেবল তাদের মর্মবেদনার কথা বলতে পারবে। দূর থেকে সবাইকেই মানুষই মনে হয়। এই মানুষের রূপে যে কিছু অ-মানুষ বাস করছে বাংলার মাটিতে, সেটার খবর আমরা অনেকেই রাখি না বা জানলেও বলি না সাহসের অভাবে।

বাংলাদেশেই মনে হয় মানুষ খুন করে বুক ফুলিয়ে খুনি বলতে পারে- আমি খুন করেছি, আমি খুনি! তারা আবার স্বাধীনভাবে ঘুরেও বেড়ায়। অন্য কোনও দেশে এমনটা হলেও, মনে হয় না আমাদের দেশের মতো কেউ পারে করতে। এরা বিভিন্নভাবে বিভিন্ন লেবেলের আশ্রয় প্রশ্রয়ে নির্ভয়ে চলতে পারছে বলেই দিনদিন দেশে ধর্মীয় বা শান্তির পক্ষে যারাই বলছে, তারাই ভিকটিম হচ্ছে।

কথাটি বলার পিছনে কারণ হচ্ছে, সম্প্রতি বিদ্যানন্দ নামে প্রতিষ্ঠিত একটি প্রতিষ্ঠান এক টাকার বিনিময়ে খাদ্য প্রকল্পের মধ্য দিয়ে ব্যাপক আলোচনায় এসেছে। যার প্রতিষ্ঠাতা একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী। এজন্যই শুধু অনেকের চোখের কাঁটা হয়ে গেছে এই হিন্দু লোকের গড়া প্রতিষ্ঠান ও এর কর্মকাণ্ড। প্রতিষ্ঠানের নামটি একটি বাংলা শব্দ। নামটি যিনি রেখেছেন তিনি একজন মুসলিম। সংগঠনের অধিকাংশ সদস্যও মুসলিম। কাজ করছে এই দেশের অসহায় মানুষদের জন্য, যাদের অধিকাংশই সেই ৯১% লোকেরই অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে অপরাধ খুঁজছে তারা, যারা দেশভাগের সময় বলেছিল হিন্দুদের বিরুদ্ধে তারা যুদ্ধ করছে!

এরাই যুক্তি তুলছে জাতীয় সংগীতের রচয়িতা একজন হিন্দু কবি। হিন্দু কবির লেখা সঙ্গীত বলেই জাতীয় সঙ্গীত পাল্টাতে হবে বলে দাবি তুলছে বিভিন্ন সামাজিক সাইটে। ভাগ্য ভালো, কেউ বলছে না এটির মিউজিক ডিরেক্টর সমর দাস, একজন খ্রিস্টান, তাহলে তো আরও যুক্তি খুঁজত।

একটি কথা না বললেই নয়, যে দেশের রাষ্ট্রীয় ধর্ম ইসলাম, সেই দেশে এমনটি হওয়া খুবই স্বাভাবিক। সেটিও মেনে নেওয়া যায়, এই বলে যে, ইসলাম শান্তির ধর্ম। এই ধর্ম সঠিকভাবে পালিত হয়ে দেশের সব নাগরিক শান্তি ভোগ করতে পারবে। সঠিকভাবে তা কি আমাদের দেশে পালন করা হচ্ছে?

দেশের সংবিধানে একটি বিষয়, চরম সত্য হলেও কেউ বিষয়টি মেনে নিচ্ছে না বা বলছে না। আমাদের স্বাধীন দেশের সব প্রধানরাই অসাম্প্রদায়িকতার কথা বলে আসছেন বরাবর, তাদের নিজেদের স্বার্থ ঠিক রাখার জন্য। অথচ পবিত্র সংবিধানকে কাঁটাছেঁড়া করে সাম্প্রদায়িকতাকে কৌশলে পাকাপোক্ত করা হয়েছে।

দেশের সংবিধানে ৯% নাগরিককে ধর্মীয় কারণে করা হয়েছে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। সেই সংবিধানের অধীনে বিদ্যানন্দ নামের প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান কিশোর কুমারের আর দোষ কি? দোষ তো তার জন্মের আর ধর্মের। তাই যদি না হতো ৯১% লোকের এই সংখ্যাগরিষ্ঠদের মধ্যে অল্পসংখক মুসলিমইবা কিভাবে বাংলা এবং বাঙালির গলা চিপে ধরে বলে- এটা হিন্দুয়ানা নাম! হিন্দুদের পরিচালিত কোনও সংগঠন ৯১% মুসলিম ধর্মাবলম্বী লোকের দেশে কিছু করতে পারবে না?

যেই বাংলায় রবি ঠাকুর, নজরুল, লালনের জন্ম, সেই দেশে মানুষের চেয়ে ধর্ম বড় হয় কি করে, অন্য কেউ বুঝলেও আমার মতো মূর্খের বোধগম্য হয় না। আমাদের দেশের সরকারপ্রধান বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বক্তব্যে বলেন, শুনি, বাংলাদেশ অসাম্প্রদায়িক দেশ, এই দেশে সবাই যে যার মতো করে ধর্ম পালনে স্বাধীনতা ভোগ করছে। ধর্ম যার যার উৎসব সবার। দেশ আমাদের এগিয়ে চলেছে।

প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্যর কারণেই প্রশ্নটা আমার প্রধানমন্ত্রীকেই করতে ইচ্ছে করছে, এত উন্নয়নের ভিড়ে বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে কিসের রোল মডেল, দয়া করে বলবেন কি আপনি?

——————–
পি.আর. প্ল্যাসিড জাপান প্রবাসী লেখক-সাংবাদিক (মতামত ব্যক্তিগত)

Related Articles

Back to top button
Close