fbpx
কলকাতাপশ্চিমবঙ্গব্লগহেডলাইন

কার জন্যে এই উৎসব

অমিতাভ বন্দ্যোপাধ্যায়: প্রকৃতি নিরন্তর তার রূপ বদল করছে। নানা রূপে, নানা ভাবে সে নিজেকে সাজাচ্ছে তার সমস্ত উপকরণ দিয়ে। আকাশ, মেঘ, রোদ, বৃষ্টি, গরম, শীত, ফল, ফুল সবেতেই তার অগাধ ঐশ্বর্য। ঋতুতে ঋতুতে সুর-তান পরিবর্তন হচ্ছে। আনন্দ বর্ষিত হচ্ছে অবিরাম। উৎসব হয়ে উঠছে। মানুষ প্রকৃতির সেই আনন্দের শামিল হয়ে নিজেও উৎসবের বৈভবে মেতে ওঠে। তবে শুধু প্রকৃতিতে তুষ্ট নয় মানুষ, প্রকৃতির অনুগত না হয়ে তাকে নিজের অনুরূপ করার চেষ্টা করে। সংসারের অন্যান্য আবশ্যক জিনিসের মত ব্যবহারযোগ্য করে নেয়। এতে আনন্দ উৎসব হয়ে ওঠার বদলে সময়ে সময়ে অত্যাচার উৎপীড়ন বলে মনে হয়।

অন্যান্য বছরের মত এবারেও যথারীতি বর্ষার কালো মেঘ তার সঞ্চিত সব জল সিঞ্চিত করে আকাশের নীল রঙ ফিরিয়েছে। কাশের ছবি আকাশে প্রতিফলিত। এইসময় স্বাভাবিকভাবে মানুষের মন, বিশেষ করে এই বাংলার, অন্ধকার থেকে আলোয় আসার আনন্দে ছুটি চায়, উৎসব চায়। বাঙালির শারোদৎসব দুর্গাপুজোয় সীমাবদ্ধ। এবছরের প্রায় শুরু থেকে কোভিডের অতিমারী সারা পৃথিবীর সঙ্গে বাংলাতেও বহাল তবিয়তে রাজত্ব করে যাচ্ছে। প্রকৃতিতে এর কোনও প্রভাব পড়েনি তাই তার কোনও হেলদোল নেই। কিন্তু এই অতিমারী মানুষের খুব ক্ষতি করছে।

প্রায় তিন প্রজন্মের মানুষ এমন আতঙ্কগ্রস্ত অন্তহীনকাল অন্তরিন হয়ে থাকেনি। সংক্রমণে আক্রান্ত ও সম্ভাব্য মৃত্যুর আতঙ্ক তার বেঁচে থাকার সব রকম অহংকার লুপ্ত করেছে। স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সম্পূর্ণরূপে ব্যাহত। ভাঁড়ারে অন্নবস্ত্রের বাড়ন্ত, অন্ন যদিও বা মেলে বস্ত্রের যোগান নেই। সামাজিক মেলামেশা প্রায় বিলুপ্তির পথে। লেখাপড়ার নামে যা চলছে তা কোনোমতেই শিক্ষাদান ও গ্রহণের পন্থা হতে পারে না কারণ শিক্ষক ও ছাত্রের মনের ভাষা কেউ পড়তে পারছে না। অফিস আদালতের অবস্থাও তথৈবচ। ব্যবসা বাণিজ্য তলানিতে এসে ঠেকেছে। গৃহবন্দি প্রবীণ মানসিক ভারসাম্য রক্ষায় ভাগ্যের হাতে সমর্পিত। নব্য-জীবন একটা ছ’ইঞ্চি বাই চার’ ইঞ্চি ছোট যন্ত্রের মধ্যে আবদ্ধ।

এই রকম অবস্থায় পুজোর বাদ্যি বাজিয়ে দিলে সরকার। শিউলি ফুটুক না ফুটুক, শরৎ এসেছে তাই পুজোও হবে। শুধু হবেই নয়, পুজো হওয়াতে উৎকোচের ব্যবস্থাও করা হয়েছে পাছে সাঁইত্রিশ হাজারের মধ্যে কোনও ক্লাব বারোয়ারি পুজো না করতে চায় তার জন্যে আগাম ব্যবস্থা। পুজো করলেই পঞ্চাশ হাজার টাকা অনুদান। এখানেই থেমে নেই, অন্যান্য সরকারি আনুষঙ্গিক খরচ লাগবে না, বিদ্যুতের খরচ আর্দ্ধেক দিলেই হবে। চমৎকার ব্যবস্থা। এর জন্যে সরকারের ১৮৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। কার টাকা? সাধারণ মানুষের থেকে আদায় করা কর। এই সাধারণ মানুষ কারা?

আমফানে ক্ষতিগ্রস্থ লক্ষ লক্ষ লোক যাদের আজও অনেকের মাথায় ছাদ নেই। কোভিডে ভিন্‌ রাজ্য থেকে কপর্দক শূন্য হয়ে ফিরে আসা লক্ষ লক্ষ শ্রমিক। কলকারখানা বন্ধ হয়ে বেকার হয়ে যাওয়া লক্ষ লক্ষ মানুষ। তাদের থেকে আদায় করা কর। কেমন করে? বেঁচে থাকার ন্যূনতম চাহিদা মেটানোর জন্যে তাদের বাজার থেকে জিনিস কিনতে হয় আর প্রতিটা জিনিস কিনতে তাদের কর দিতে হয়। এই ১৮৫ কোটি টাকার মধ্যে তাদেরও অংশ আছে। সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থার বাইরে হাজার হাজার লোকের কোভিডের চিকিৎসার নামে যে লুঠের কারবার চলছে বেসরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে সেখান থেকেও সরকার কর বাবদ ভালো টাকা পায়। সর্বস্বান্ত হয়ে গেছে কত লোক। কার আনন্দের জন্যে এই ঢক্কানিনাদ? কে উপভোগ করবে? গ্রামের এবং শহরের বেশ কিছু লোক যারা সরকারি বিনি পয়সার চাল-ডালের জন্যে হা পিত্যেশ করে বসে আছে? পুজোর মাইক তাদের মনে আনন্দের ঢেউ তুলতে সক্ষম হবে?

সরকারি তরফে কিছু নিয়মকানুন বলে দেওয়া হয়েছে যেমন খোলামেলা প্যান্ডেল, স্যানিটাইজার ও মাস্কের অবশ্য ব্যবহার ইত্যাদি। সে তো চলছেই, আটকানো যাচ্ছে লোকের আইন-না-মানা মানসিকতা এবং সংক্রমণের হার? পুজোর জৌলুষ যা কিছু শহর ও তার প্রান্তিক এলাকাগুলোতে। শহরের বাইরে আলো বা প্যান্ডেলের দেখনদারি খুবই নগন্য। দলে দলে লোক বাইরে থেকে আসে সাত-দশ দিনের আলোকজ্জ্বল শহরের রূপ দেখবে বলে। কিন্তু এবার কি তা সম্ভব হবে? মাসের পর মাস ব্যবসায় মার খেতে থাকা ব্যবসায়ীদের থেকে বিজ্ঞাপন আদায় কম হবে মেনে নিয়ে সরকারের দান-খয়রাতি। কিসের বাধ্যবাধকতায় কোটি কোটি মানুষের ইচ্ছের বিরুদ্ধে এই আয়োজন?

একশো বছর আগে ফ্লু অতিমারী সারা পৃথিবীতে পাঁচ কোটি মানুষের জীবন শেষ করে দিয়েছিল এবং বাংলাও সেই অতিমারীর হাত থেকে রেহাই পায়নি। কিন্তু তার জন্যে যে দুর্গাপুজোয় কিছু বিঘ্ন হয়েছিল বা কম হয়েছিল বিশেষত বারোয়ারি পুজোয় তার কোনও লিখিত প্রমাণ মেলে না বরং ১৯১৯ সালে নতুন পুজো বাগবাজার সার্বোজনীন দুর্গাপুজো শুরু হয়েছিল। ফলে কোনও অতিমারীর বাঙালির পুজো-জনিত উৎসবকে দাবিয়ে রাখতে অপারক। সেই আবেগ এবারেও কাজ করছে আর তার সঙ্গে যোগ হয়েছে রাজনীতি। ধর্মীয় সংস্কারের সঙ্গে রাজনীতি যুক্ত হলে প্রতিযোগিতার আবহে আবেগ বেড়ে যায় বহুগুণ। অন্ধ আবেগ মানুষের সুবিচার মন হনন করে, মনুষ্যত্ব লোপ পায়। এবছর অতিমারীর প্রকোপে টোকিও অলিম্পিক, চ্যাম্পিয়নস লিগ, ইউরো কাপ, ফ্রেঞ্চ ওপেনের মত বিশ্বখ্যাত খেলা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অন্যান্য সংস্কৃতিমূলক সামাজিক অনুষ্ঠান যেমন চিনা নিউ ইয়ার উৎসব, জাপানের চেরি উৎসব, জার্মানে বিয়ার উৎসব, স্পেনে সান ফার্মিন উৎসব বাতিল বা নামমাত্র করা হয়েছে। প্রতিটা উৎসবের সঙ্গে বিরাট আর্থিক সম্পর্ক আছে। ধর্মীয় উৎসব যার যার বাড়িতে অথবা উপাসনা গৃহে সংক্ষেপে করা হয়েছে।

কলকাতারই এক স্বনামধন্য পুজো কমিটি গত বছরে এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ভার্চুয়াল পুজোর আয়োজন করে। বিভিন্ন ওয়েবিনারে এখন যেমন হচ্ছে সেভাবেই লোকেদের জন্যে ঠাকুর দেখা, পুষ্পাঞ্জলি ইত্যাদির আয়োজন ছিল এবং অন-লাইনে পুজোর উপকরণও দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। এটা যে নতুন কিছু তা নয়, তিরুপতি, সিদ্ধিনায়ক গণপতি প্রভৃতি কয়েকটা মন্দিরে ভার্চুয়াল পুজোর ব্যবস্থা চালু রয়েছে। হাতে গোনা কয়েকটা বাড়ির পুজো বাদ দিলে বাংলায় দুর্গাপুজো বলতে বারোয়ারি এবং এদের কোনো নিজস্ব উপাসনালয় বা মন্দির নেই। রাস্তাঘাটে মাঠে ময়দানে যেখানে হোক বাঁশের প্যান্ডেল করে পুজো এবং পুজোর নামে হৈ-হুল্লোড়। মন্দিরে পুজো হলে যদিওবা শৃঙ্খলা বজায় রাখা যায়, খোলা জায়গায় তা প্রায় অসম্ভব এবং তার জন্যে যে পরিমাণ লোকবল এবং আনুষঙ্গিক ব্যবস্থা দরকার সেটাও খরচ সাপেক্ষ। অন্য ধর্মের অনুষ্ঠানে প্রশাসন উপযুক্ত ব্যবস্থা নিয়ে সংক্রমণ আটকাতে সক্ষম হলেও হিন্দু বাঙালির দুর্গাপুজোয় সেই ঝুঁকি নিতে রাজি নয় প্রশাসন, প্রধান বিরোধী দল ঘাড়ের ওপর শ্বাস ফেলছে।

আরও পড়ুন: করোনায় আক্রান্ত হলেন সমাজবাদী পার্টির প্রতিষ্ঠাতা মুলায়ম সিং যাদব

 

একদিকে অতিমারীর সংক্রমণের হার বাঁধনছাড়া ঊর্দ্ধমুখী অন্যদিকে অতিমারি চিকিৎসার কাঠামোগত অপূর্ণতার জন্যে স্বাস্থ্যকর্মীদের দুরাবস্থা। এই অবস্থায় কার জন্যে এই উৎসব? যে কোনও উৎসবের প্রাণ শিশুরা। পারবে কি কোনও অভিভাবক তাদের সন্তানদের ছেড়ে দিতে প্যান্ডেলে? ওরাই তো নিজেরা উৎসব হয়ে উৎসবকে উজ্জীবিত করে। বড়রা তো নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত, আনন্দে যত মন উৎসবে নয়। শিশুরাই যদি শিউলির মত এই উৎসবে শামিল না হতে পারে নীল আকাশ কি আবার মেঘে ঢেকে যাবে না? শরৎ নিজেই গা-ঢাকা দিয়ে শীতকে আহ্বান জানাবে।

(মতামত নিজস্ব)

 

Related Articles

Back to top button
Close