fbpx
গুরুত্বপূর্ণব্লগহেডলাইন

নিরীহ মহিলার মুণ্ডুছেদ করে কি ইসলাম বাঁচবে ?

কাজি মাসুম আখতার: মুখে আল্লা- হু-আকবর জিগির। হাতে তলোয়ার।গির্জার অভ্যন্তরে এক মহিলার মুণ্ডুছেদসহ আরও দুজন নিরীহ বিধর্মীর হত্যা সম্পন্ন করে উল্লাসে ফেটে পড়ল জনৈক ইসলামের রক্ষক। ২০১৫ সালে শার্লি এবদোর ১২ জনকে হত্যার পর কদিন আগেই তারা মুণ্ডুছেদ করেছে বিধর্মী ইতিহাস শিক্ষকের। যিনি তার পড়ুয়াদের বাক-স্বাধীনতার পাঠ দিতে গিয়ে শার্লি এবদোর তৈরি নবির ব্যাঙ্গ চিত্রটি তুলে ধরেছিলেন। হ্যাঁ-তাই তৈরি হল- ‘ইসলাম খ্যাতরে পে”-এর অজুহাত। ঘটনা-স্থল সাম্য, ধর্মীয় বা বাক-স্বাধীনতার লালনভূমি ফ্রান্স। উদারতার তীর্থভূমি যে ফ্রান্স ইউরোপের প্রতিবেশী দেশের নিষেধকে অগ্রাহ্য করে হাজার হাজার অসহায় মুসলিম শরণার্থীদের নিজ দেশে আশ্রয়দানে কখনও কুন্ঠিত হয়নি। যে দেশ তাই ইউরোপের অন্যতম মুসলিম বহুল দেশ। শুধু তাই নয় সহজাত আদর্শেই যে দেশ মুসলিমসহ কোনও সংখ্যালঘুদের মর্যাদা ও ক্ষমতায়ন প্রদানে কখনও পিছ পা হয়নি। আজ সেই দেশের রাষ্ট্রপতিকে বলতে হচ্ছে, “ইসলাম বর্তমানে একটি সংকটাপন্ন ধর্ম”, এদের বিরুদ্ধে ইউরোপের সতর্ক হওয়ার সময় এসেছে! নজিরবিহীনভাবে ফ্রান্সের মতো দেশের একজন রাষ্ট্র প্রধানের এহেন মন্তব্যের পশ্চাতে আসলে কাদের দায় কার্যকরী? ক্ষতিটাই-বা কাদের ? উত্তর একটিই ক্ষয়রোগগ্রস্ত, পক্ষাঘাতে আক্রান্ত ধর্মীয় গোঁড়ামি ও অন্ধত্বের যাঁতাকলে ক্রমেই ডুবে মরা মুসলিম জাতির!যাদের একাংশ জাতির আত্মহত্যা ঘটাচ্ছে আর বাকি অংশ নীরবে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছে।আর সামান্য প্রতিবাদীদের জন্য শানিত হচ্ছে চকচকে চুরি বা ঝলসে ওঠা তরবারী।

কিন্তু এমনটি তো হওয়ার কথা ছিল না।ইসলাম প্রচারকালে দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে মক্কায় নবি মহম্মদ(স:)এর জীবন ছিল যন্ত্রনা,অত্যাচার,উপেক্ষা ও অপমানের ইতিবৃত্ত। নবির বিরুদ্ধচারণকারীরা মিথ্যার জাল বুনে নবিকে বারে বারে চূড়ান্ত অবমাননাকর কুৎসায় বিদ্ধ করেছিল। স্বয়ং নবি ক্ষমতা প্রাপ্তির পরেও তাদের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ না নিয়ে অবলীলায় ক্ষমা করেছিলেন। সত্যের জয় একদিন হবেই, শান্তির পথ-মুক্তির পথ,ক্ষমা পরম ধর্ম এই আদর্শকে তিনি তার অনুগামীদের অন্তরে প্রোথিত করতে চেয়েছিলেন। তা সত্ত্বেও আজ ১৪-শ বছর পরেও এই আধুনিক বিশ্বে তার অনুগামীদের মধ্যে একি দেখছি ! ধর্মীয় আবেগের কষ্টকল্পিত দোহাই দিয়ে কি ইসলামে চিন্তার স্বাধীনতা, শিল্পের স্বাধীনতা বা বাক-স্বাধীনতাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে ? তাহলে ইসলামের নিয়ন্ত্রণ এখন কাদের হাতে ? ইসলামের শান্তি,সাম্য,স্বাধীনতা বা সহিষ্ণুতার বার্তা কি তাহলে কেবলই কথার কথা ? আর সেই কারণেই কি শার্লি এবদোয় নবির ব্যাঙ্গ চিত্র অঙ্কনকারীর থেকে নবিকে শত গুণ অবমাননার কারণ হয়ে উঠেছে তার সাধের অনুগামীরাই!যাদের চোখে আছে অন্ধর্ত্বের ঠুলি। চেতনায় রয়েছে গোঁড়ামি ও অজ্ঞতার ছোবল! যে ছোবলে আজ গোটা মুসলিম বিশ্ব আক্রান্ত।হ্যাঁ– নিদারুণ এক ক্ষয়রোগে! তাই সর্বত্রই তারা কেবল অবহেলা,উপেক্ষা ও উপহাসের পাত্র। তাই প্রায় গোটা বিশ্বেই এরা ধুঁকছে অশিক্ষা, দুর্বলতা ও দারিদ্রতায় ! মাঝে মাঝে সন্ত্রাসী হামলা’ নবির বা কোরান অবমাননার জিগির তুলে কারও গলা কাটা, গুলি করে, বোমা মেরে বা মানব বোমা হয়ে নিরীহদের প্রতিপক্ষ ভেবে হত্যা করা, এগুলি আসলে এই জাতির নিজেকে নিজেই ধ্বংস করার কিছু উপসর্গের প্রকাশ মাত্র ! দুর্বলের আস্ফালন যে এমনই হয়! তবে সবলরাই-বা ছেড়ে দেবে কেন ! ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতির বচনে মনে হয় সেই কথাই প্রতিভাত —এর হাত থেকে মুক্তির জন্য সোচ্চার আন্দোলন বা প্রতিরোধ যুদ্ধে নামার কথা গোটা বিশ্বের সদা জাগরুক মুসলিম সুশীল সমাজের। দুঃখের যে –তাদের অবস্থান যুগ যুগ ধরে মুক ও বধিরের ন্যায়। মহানবি তার কুলাঙ্গার অনুগামীদের আর কত ক্ষমা করবেন!!!!!!!! তাই কি আল্লার গজব (অভিশাপ)এই জাতির উপরেই সবচেয়ে বেশি বর্ষিত হচ্ছে ?

চিনে উইঘু মুসলিমদের উপর হিটলারী নির্যাতন, মায়ানমারের রোহিঙ্গাদের সঙ্গে পশুসুলভ বৈরিতা বা ইসরায়েলের প্যালেস্টাইনি মুসলিমদের উপর ধারাবাহিক আগ্রাসন ও নির্যাতন কি এই অভিশাপের ফসল নয় ? এই অপরাধ রুখে দেওয়ার বুকের পাটা এই দুর্বল জাতির কারও কি হয়েছে? হয়নি। কারণ এই যোগ্যতা তারা অর্জন করতে পারেনি বা শেখেনি। ফ্রান্স এবার চিনের পথ নিলে ঠেকানোর সাধ্যি কার আছে ? যে চিনে মুসলিমদের কোরআন পড়া, নমাজ পড়া, রোজা রাখাও আজ নিষেধাজ্ঞার মুখে ! নিত্য-নৈমিত্তিক যেখানে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে মসজিদ। মুসলিম নারীদের চরম নির্যাতন করে যেখানে কেড়ে নেওয়া হয়েছে লক্ষ লক্ষ মুসলিমদের ন্যূনতম ধর্মীয় সত্ত্বা। কোন মুসলিম দেশের কি সাহস হয়েছে” টু” শব্দটি করার ? ইসলামের স্বঘোষিত রক্ষক সৌদি আরব বা পাকিস্তানের মতো দেশগুলি প্রতিবাদ তো দূরের কথা, নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় চিনের পদলেহনেই যে তারা দিন-রাত ব্যস্ত ! কেন একটি গোটা জাতি বিশ্বে অসম্মানের অন্ধকারে প্রায় ধুঁকছে। অথচ এদের মুখে শুধু ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্বের জিগির। অহঙ্কার, অহমিকা।যা কেবলই উপহাসের অট্টহাসি ছড়ায়।

মধ্যযুগের ঊষালগ্নে যে জাতি বিজ্ঞান চর্চায় যুগান্ত এনেছিল, আজ তারা অশিক্ষার অতলে কেন ? এর দায় কাদের ? কেন তারা দুর্বল ? তারা দুর্বল বলেই-তো ছোট্ট একটি প্রতিবেশী দেশ ইসরায়েল তৈল সম্মৃদ্ধ ধনী হওয়া সত্ত্বেও আরবের প্রতিটি মুসলিম দেশসমূহকে (ব্যাতিক্রম ইরান) প্রতিনিয়ত চমকাচ্ছে। ধমকাচ্ছে।দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় হিটলার ইহুদি জাতির ধ্বংস সাধনে “ইহুদি নিধন যজ্ঞ” চালিয়ে পৃথিবীর এক তৃতীয়াংশ ইহুদিদের হত্যা করেছিল। এহেন চূড়ান্ত বিপর্যয়ের মোকাবিলা করে খাদের কিনারায় দাঁড়িয়েও আজ অতি দ্রুত এই ক্ষুদ্র জনজাতি পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত, সমৃদ্ধ, মর্যাদা সম্পন্ন জনজাতি। কিভাবে সম্ভব হল ? এই শিক্ষা গ্রহণ কি মুসলিম জাতির দিশা হতে পারে না ? ইহুদিদের এই মিরাকলের পিছনে রয়েছে এদের আত্মশক্তি, সাধনা, শিক্ষা তথা বিজ্ঞান চর্চায় অসাধ্য সাধন। সর্বোপরি, নিজ জাতির প্রতি প্রত্যেকের দায়বদ্ধতা ও বিশ্বে নিজেদের অস্তিত্বকে জাগরুক রাখার অধ্যাবসায়। উল্টোদিকে পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম জনজাতি মুসলিমদের দিকে নজর দিন। কেন তাদের হাঁড়ির হল ? ইসলাম কি তাদের দুর্বল, দরিদ্র থাকতে বলেছে ? কেন তারা আমেরিকা, জার্মান, জাপান, ইসরায়েল হতে পারে নি ? কে বারণ করেছে ? বিজ্ঞানের জয়যাত্রার যুগে যখন প্রতিবেশী জাতিসমূহ নিজেদের আধুনিকতা, যুক্তির উত্তাপে নিজেদের প্রতিনিয়ত জারিত করে চলেছে, মুসলিম বিশ্বের বৃহৎ অংশ তখন মধ্যযুগীও ধর্মীয় খোলসে আরও বেশি করে নিজেদের গুটিয়ে নেওয়াকে মুক্তির পাথেয় করে চলেছে। এরা বুঝেছে এদের মুক্তি আসলে স্বর্গলাভে। তাই মর্ত্যে ধর্মের জন্যে মৃত্যু বরণে এদের অনেকের শান্তি। তাই কি এই সমাজে এত মানব বোমা ? এখনই সংযত না হলে এই ধারা কিন্তু অনেক অনেক গুণ বাড়বেই। হ্যাঁ–গোটা বিশ্বজুড়েই। দু-চারশো মুণ্ডুছেদ করে পৃথিবীর দুশো কোটি মুসলিমকে দুর্দশার দুর্বিপাকে ডুবিয়ে মারার এই ষড়যন্ত্র কবে বন্ধ হবে ! পাঠক বন্ধুরা কি বলেন ?

(মতামত নিজস্ব)

Related Articles

Back to top button
Close