fbpx
গুরুত্বপূর্ণব্লগহেডলাইন

দেশেই বিশ্বমানের শিক্ষা দেওয়া হোক ভারতীয় পড়ুয়াদের

আর কে সিনহা: এ বিষয়টি কখনও খেয়াল করেছেন, প্রতি বছর ভারত থেকে লক্ষ লক্ষ পড়ুয়ারা শিক্ষালাভের জন্য আমেরিকা, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা প্রভৃতি দেশে চলে যাচ্ছেন? এই প্রশ্ন উঠে আসার প্রধান কারণ হল-আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে অধ্যয়নরত বিদেশি পড়ুয়াদের বড়সড় ধাক্কা দিয়েছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই বিদেশি পড়ুয়াদের মধ্যে ভারতীয় পড়ুয়াদের সংখ্যা অনেকটাই বেশি। বিদেশি পড়ুয়াদের উদ্দেশে আমেরিকা জানিয়ে দিয়েছে, যদি তাঁদের কলেজ অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা সম্পূর্ণ অনলাইনে হয়, সেক্ষেত্রে তাঁদের অন্য কোনও প্রতিষ্ঠান অথবা কোর্সে ভর্তি হতে হবে যেখানে প্রত্যক্ষ উপস্থিতির মাধ্যমে পড়াশোনা চলছে, অথবা আমেরিকা ছেড়ে নিজেদের দেশে ফিরে যেতে হবে তাঁদের। কারণ অনলাইন পড়াশোনার জন্য তাঁদের ভিসা দেওয়া হবে না। আসলে করোনা-প্রকোপের কারণে আমেরিকার অধিকাংশ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে অনলাইনে ক্লাস নেওয়া হচ্ছে।

আমেরিকায় পাঠরত এই বিদেশি পড়ুয়াদের মধ্যে লক্ষ লক্ষ ভারতীয় পড়ুয়া রয়েছে। করোনা-প্রকোপের কারণে ট্রাম্প প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত লক্ষ লক্ষ ভারতীয় পড়ুয়ার ঘুম কেড়ে নিয়েছে। মূল বিষয় হল, আমাদের দেশের শিক্ষাস্তর আরও বেশি করে প্রগতি কেন করছে না? আর তাই প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ ভারতীয় পড়ুয়াকে উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে যেতে হচ্ছে। আমরা কী আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে ভালো ফ্যাকাল্টি এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দিতে পারছি না? মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৮ সালে ৬.২০ লক্ষ ভারতীয় পড়ুয়া পড়াশোনা করার জন্য দেশের বাইরে গিয়েছেন। যদিও ২০১৭-১৮ সালে ৭.৮৬ লক্ষ পড়ুয়া দেশের বাইরে পড়াশোনা করতে গিয়েছিলেন।

আরও পড়ুন:কেন্দ্রের বেসরকারিকরনের প্রতিবাদের আঁচ কলকাতায়, RBI এর সামনে প্রতিবাদে তৃণমূল

অধিকাংশই স্নাতক স্তরের ডিগ্রিলাভের জন্য বিদেশে যান। স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভের জন্য বিদেশে যাওয়ার সংখ্যা তুলনামূলক কম। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ পড়ুয়া বিদেশে চলে যাওয়ার কারণে দেশের কোটি কোটি টাকা বিদেশে দিতে হয়। ৮ লক্ষ পড়ুয়া প্রতিবছর যদি ৫০-৬০ হাজার ডলার পর্যন্ত বিদেশে নিয়ে যায়, তাহলে ভাবুন দেশের কত হাজার কোটি টাকা বিদেশে যাচ্ছে। ভেবে দেখুন আমাদের পড়ুয়ারা কানাডা, আয়ারল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইউক্রেন এমনকি চিন পর্যন্ত চলে যাচ্ছেন। কোনও পড়ুয়া যদি গবেষনা প্রভৃতির জন্য আমেরিকার এমআইটি অথবা কলোরাডোর মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন, সেটা মোটেও খারাপ নয়। আমেরিকার কিছু কিছু বিশ্ববিদ্যালয় দুর্দান্ত ফ্যাকাল্টি এবং অন্যান্য সুবিধার কারণে সত্যিই অনেক বেশি উন্নত। ব্রিটেনের অক্সফোর্ড এবং কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কেও একথা বলা যেতে পারে। এই সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু অধ্যাপক নোবেল পুরস্কার বিজেতাও। তাই এই সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলে কোনও সমস্যাই নেই। কিন্তু আমাদের দেশের পড়ুয়ারা হোটেল ম্যানেজমেন্ট, এমবিএ অথবা সামান্য স্নাতক ডিগ্রির জন্য যদি আমেরিকা, ব্রিটেন, কানাডা, ইউক্রেন প্রভৃতি দেশে যায়, এই বিষয়টি মোটেও বোধগম্য হচ্ছে না। এই তথ্যও প্রকাশ্যে এসেছে যে, বিদেশে পড়াশোনা করতে যাওয়া আমাদের সন্তানদের অনেক সময় কষ্ট সহ্য করতে হয়। আমাদের পড়ুয়ারা বিদেশি তিক্ত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন। ততক্ষণে অবশ্য অনেক দেরিও হয়ে যায়। শিক্ষা লোনের নামে তাঁদের অভিভাবকরাও মোটা অঙ্কের লোন নিয়ে থাকেন।

যাইহোক, কাউকে শিক্ষালাভের জন্য বিদেশে যাওয়া থেকে আমরা তখনই বাধা দিতে পারব যখন আমাদের দেশের শিক্ষাস্তর উন্নত হবে। তা তো মোটেও নয়। আইআইটি দিল্লি, মুম্বই, মাদ্রাজ, কলকাতা ও বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো কিছু বিশ্ববিদ্যালয়কে বাদ দিলে দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের হাল কার্যত বেহাল। কোথাও পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, কোথাও রাজনীতি সবকিছু নষ্ট করে দিচ্ছে।

এবার বিহার, পূর্ব উত্তরপ্রদেশ, ওড়িশা এবং ঝাড়খণ্ডের কথা বলা যাক। প্রতিবছর এখান থেকে হাজার হাজার যুবক দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত সেন্ট স্টিফেন্স, হিন্দু মিরান্ডা হাউস, লেডি শ্রীরাম, শ্রীরাম কলেজ ও কমার্স, রামজস হংসরাজ প্রভৃতি কলেজে পড়াশোনা করতে আসেন। বিহারি পড়ুয়ারা কয়েক দশক ধরে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে আসছেন। যদিও কয়েকজনই ভর্তি হতে পারেন। তাঁরা নিজেদের রাজ্য অথবা শহরের কলেজগুলিতে পড়াশোনা করতে চান না, কারণ সেখানে সব কিছু রামের ভরসায় চলে। প্রতিবছর দিল্লিতে আসা ১০ শতাংশ পড়ুয়ারাও কলেজের ভিতরে হোস্টেল পান না। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় খারাপভাবে জীবনযাপন করেন তাঁরা, একটি ঘরে ৮-১০ জন পড়ুয়া থাকে। এটা সঠিক যে তাঁদের নিজ নিজ শহরে যদি কলেজ খুলে যায়, তাহলে দিল্লি, পুণে, বেঙ্গালুরু অথবা দেশের কোথাও যেতে হবে না তাঁদের। কেউ কী এবিষয়ে ভাবছেন? মনে তো হচ্ছে না।

আরও পড়ুন:আমফান নিয়ে দুর্নীতি! তিন তৃণমূল নেতাকে সাসপেন্ড করল দল

কিছু মনে করবেন না, নিজেদের সন্তানদের বিদেশে পাঠানোর জন্য আমরা যত টাকা খরচ করি, সেই টাকার অর্ধেকও যদি দেশের শিক্ষার মান উন্নয়নে ব্যয় করতাম, তাহলে আমাদের সন্তানদের দেশের বাইরে যেতেই হত না। একটি উদাহরণ রাখতে চাই, মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক প্রতিবছর দেশের কলেজগুলির Ranking প্রকাশ করে। দেশের সেরা কলেজগুলি তাতে স্থান পায়। দেখা যাচ্ছে প্রতিবছর দেশের কয়েকটি কলেজই এই তালিকায় স্থান করে নিচ্ছে। ২০২০ সালের কলেজ ক্যাটাগরিতে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজগুলির রমরমা ছিল। সেরা দশের মধ্যে পাঁচটি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং সেরা ২০-র মধ্যে ১২টি কলেজ ছিল। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের মিরান্ডা হাউস প্রথমে এবং হিন্দু কলেজ তৃতীয় নম্বরে ছিল। চতুর্থ স্থানে ছিল সেন্ট স্টিফেন কলেজ। এই তালিকার মধ্যে ছিল মাদ্রাসা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্সি কলেজ, লোপালা কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ। বিভিন্ন মানদণ্ডের ভিত্তিতে কলেজগুলিকে Ranking দেওয়া হয়। এখন ভাবুন দেশের বাকি হাজার হাজার কলেজগুলিতে কী হচ্ছে? ওই সমস্ত কলেজগুলিকে উন্নত করতে হবে, যাতে শিক্ষা স্তরের দিক দিয়ে হিন্দু কলেজ অথবা মিরান্ডা হাউসের মতো হয়ে ওঠে এবং তা সম্ভবও। দৃঢ়, ইতিবাচক পরিকল্পনা এবং প্রচেষ্টার প্রয়োজন।

(মতামত নিজস্ব)

Related Articles

Back to top button
Close