fbpx
অন্যান্যবাংলাদেশহেডলাইন

বিশ্ব কুইজিন

বাঁচার জন্য খাওয়া নাকি খাওয়ার জন্য বাঁচা – এ ভাবনার কোনও মীমাংসা নেই। তবে যার জন্যই যা হোক না কেন, রসনা তৃপ্তিতে তৎপর হই আমরা সবাই। আলুসেদ্ধ ভাত পরম তৃপ্তি দিলেও মাঝে মাঝে আমাদের স্বাদকোরকগুলি একটু বদল চায়। আর সেই বদল অবশ্যই সাধ এবং সাধ্যের মধ্যে রেখেই আমরা করতে চাই। কেউ কেউ আবার সারা পৃথিবীর কড়াই খুন্তির লড়াইকেই চেখে দেখতে চান। সেই কথা মাথায় রেখেই যুগশঙ্খ ডিজিটালে বিশ্ব কুইজিন। আজ  বাংলার  রসনা তৃপ্তিতে দুই বাংলার খাবারের গল্প।

অভী নীলোৎপল: বাংলার ও বাঙালির রান্নার প্রসঙ্গ আসলে আবশ্যিকভাবে এসে পড়ে তুলনামুলক আলোচনা। প্রথম পর্বে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের রান্নার কথা বলেছিলাম। এইবার তারই মধ্যে তুলনামুলক বিচার করলে কারোর এটা ভালো, কারোর ওটা ভালো এরকম হবেই। তবুও বাকিরা শুনে রাগ করলেও বলব, ভাষার প্রমিত চেহারার মতন ওই মধ্যবঙ্গের রান্নাই প্রমিত বাঙালি রান্না। এর মধ্যে আছে বৃহত্তর যশোর-উত্তর চব্বিশ পরগণা-খুলনা-কুষ্টিয়া-নদিয়া-মানিকগঞ্জ-ঢাকা-কলকাতা। যদিও ঢাকা জেলার রান্নার স্বাতন্ত্র্য রয়েছে কিন্তু কলকাতার স্বাতন্ত্র্য বলে কিছু নেই। তবে কলকাতায় ঘটি-বাঙাল আলাদা কুইজিন রয়েছে। কালের গতিকে সেখানে মিশেছে উড়িয়া ঠাকুরের রান্না। উত্তর কলকাতায় ঘটিদের রান্না; দক্ষিণ কলকাতায় বাঙালদের রান্না আর ‘পাইস হোটেলে’ ‘মেদনীপুরি-উড়িয়া’ রান্না। কিন্তু ঢাকাইয়া রান্না, বিশেষত পুরান ঢাকার কুট্টিদের রান্না, তার সবেতেই অনবদ্য স্বাদ-গন্ধের মাধুর্য রয়েছে। যে যতই তর্ক করুক, ঢাকার রান্না সেরা রান্না, এ মানতেই হবে। এর সঙ্গে ঢাকার নবাবি খানা তো আছেই। তার মধ্যেও বলা হয় বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরীর মধ্যখানের যে অঞ্চল; মূলত কেরানিগঞ্জ-শুভাঢ্যা; সেই এলাকার মহিলাদের হাতের রান্না সৈরিন্ধ্রী-দ্রৌপদীকেও হার মানাবে। সেইসব আস্বাদনের সুযোগ আমার হয়নি। দুঃখের কথা, পুরনো ঢাকাইয়া বাঙালি রান্না এখন আর ঢাকা শহরে পাওয়া যায় না। আদি ঢাকার মানুষরা সকলেই দেশের বাইরে; সারা দুনিয়ায় তারা শরনার্থী-অভিবাসী।

আরও পড়ুন:অধিক পুরুষোত্তম মল মাস – ভ্রান্ত ধারণা দূর হওয়া প্রয়োজন

পুরান ঢাকার বিউটি বোর্ডিং-এ কেবলমাত্র কিছু পদ চেখে দেখা যায় মাত্র। এমনিতে এখন বাংলাদেশি-বাঙালিরা নিরামিষ খাওয়া বর্জন করেছেন। সবেতেই পেঁয়াজ-রসুন ব্যবহার করে এক আলাদা খাদ্যাভ্যাস গড়ে উঠেছে বাংলাদেশে। অথচ এখন যাঁদের বয়স ষাটের উপর, তাঁরা কিন্তু দিব্যি নিরামিষ খান বা খাবার স্মৃতি রোমন্থন করেন। পুরান ঢাকার রান্না খেতে গেলে আসলে সে দেশের বাইরে যেতে হবে। আসতে হবে কলকাতায় (কিছু পরিবারে বংশানুক্রমিকভাবে কিছু রান্না টিঁকে আছে) বা আমেরিকায়-ইংলণ্ডে। ঢাকা শহরে এখন কাজের সূত্রে বাইরের সমস্ত জেলার মানুষ। আজ সে শহরের ফ্ল্যাটবাড়ি-মেসে ময়মনসিংহের ‘বুয়া’রা কলেজ-ভার্সিটি-অফিস যাত্রীদের মাছ-ভাতের জোগান দেন। সেই ‘বুয়া’দের বিচিত্র রান্নার ধরন সব। সে যাই হোক, আজ আপনাদের শোনাব একটি পশ্চিমবঙ্গের রান্না আরেকটি পূর্ববঙ্গের ধাঁচে দক্ষিণবঙ্গের রান্নার গল্প। ও হ্যাঁ আরেকটা কথা আবার বলি, আমার খাবারের গল্পে আমি ইচ্ছে করেই নির্দিষ্ট পরিমাণ উল্লেখ করি না খুব প্রয়োজন ছাড়া। যিনি রান্না করেন, তাঁর নিজের আন্দাজটিই যেকোনও রান্নার প্রাণভোমরা।

পেঁয়াজ পোস্তু
পোস্তকে রাঢ়বাংলায় গিন্নিরা পোস্তু বলেন। আমিও তাইই বলছি। পোস্তু বাটুন খানিকটা। কৃপণতা করবেন না। ভেজাল হিসেবে কুমড়োবীজবাটা দেবেন না আবার। খাঁটি পোস্তু বেটে নিন কাঁচালংকা দিয়ে। শিলনোড়াতেই বাটবেন। গ্রাইণ্ডারে বাটলে শুকনো শুকনো হবে, তেল বেরোবে না। স্বাদটাই মাটি। কড়ায় সরষের তেল দিন। সরু সরু করে পেঁয়াজ কেটে গরম তেলে দিন। নুন দিন। ভাজা ভাজা হলে বেটে রাখা পোস্তু দিয়ে দিন । সরষের তেল এতটা দেবেন যাতে হলুদ না দিতে হয়, তেলের জন্যই পোস্তুর মধ্যে হলদে ভাব এসে যায়। এইবার নাড়তে নাড়তে আঠা আঠা ভাব এসে গেলেই নামিয়ে নিন। গরম ভাতে পরিবেশন করুন। এখানেও ভাত ঠাণ্ডা হলে পেঁয়াজ পোস্তুর অপমান। সেটা দিয়ে খেয়ে আঙুল চাটতে চাটতে কলাই ডালের বাটিটা এগিয়ে নিন পাতের কাছে।

চিংড়িখোসার ভর্তা

মূলত দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা আর সাতক্ষীরার রান্না এটি। আমি নিজে রাঁধবার সময় নিজের মতন করে নিয়েছি। সেই গল্পটাই করি। বাগদা চিংড়ি বাজারে কেনবার সময় বলে দিন মাথা ও খোসা আলাদা ব্যাগে দিয়ে দিতে। শুঁড়-পা বাদ দিতে বলবেন। মাথার ওই ধারালো রস্ট্রামও বাদ দিতে বলবেন। এইবার বাড়িতে এনে ভালো করে ধুয়ে নিন। গরমজলে ভাপিয়ে নিন নুন দিয়ে। এরপর গ্রাইণ্ডারে দিয়ে দিন জল ঝরিয়ে। বেশ খানিকক্ষণ গ্রাইণ্ড করুন। চামচ দিয়ে মণ্ডকে নেড়েচেড়ে দিন কয়েকবার। ধৈর্য নিয়ে মিহি করে ফেলুন। এরপর শুরু আসল কাজ। শিলপাটায় ওই গ্রাইণ্ডারে বাটা মণ্ডকে আবার বাটুন। অন্তত দু’বার। এখন দেখবেন বেশ মসৃণ ভর্তা হয়েছে। এইবার এইখানে আমি কুমিল্লার ভর্তার কনসেপ্ট কাজে লাগিয়েছি। দুটো আলু সেদ্ধ করেছি। কাঁচামরিচ, পেঁয়াজ-রসুন বেটেছি। কড়ায় সাদা তেল দিয়ে খোসাবাটা, আলুসেদ্ধ, মরিচ বাটা, পেঁয়াজ-রসুন বাটা দিয়ে নাড়াচাড়া করলাম বেশ খানিকক্ষণ। লবণ-হলুদ দিলাম। সুঘ্রাণ বেরোতেই নামিয়ে নিলাম। খেতে এত মজা হয়েছিল যে, বাগদার মালাইকারি বাদ দিয়ে খোসারভর্তা দিয়েই ভাত সাবাড় করেছিল সক্কলে। একজন তো খানিক বাড়িও নিয়ে গেল। একেই বলে আসলের চেয়ে সুদ মিষ্টি। আপনারাও খেয়ে দেখুন। একমত হবেন আমার সঙ্গে।

কৃতজ্ঞতা – লিলু মাহাতো, সঞ্চয়িতা গাইন ও আবুল হাশিম

Related Articles

Back to top button
Close